সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির বঙ্গবন্ধু

149

Published on মার্চ 12, 2020
  • Details Image

নাজনীন বেগমঃ

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম নেয়া বঙ্গবন্ধু তাঁর জন্ম শতবর্ষের সুবর্ণ অধ্যায়ে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর ৮০তম জন্মবার্ষিকীতে নিজেই একটি কালজয়ী গান লিখেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবর্ষের শুভক্ষণে-পদার্পণে সেই গান স্মরণ করতে চাই-

হে নতুন দেখা দিক আর বার/ জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।/ তোমারও প্রকাশ হোক/ কুহেলিকা করি উদ্ঘাটন/সূর্যের মতো।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, জীবদ্দশায় কবির এটাই ছিল শেষ জন্মদিন উদ্যাপন। বঙ্গবন্ধুকেও জানাই তেমন অভিবাদন, শ্রদ্ধা, ভালবাসা সঙ্গে তাঁর আলোকিত জগতের দ্যুতিময় অধ্যায়ে সারা বাংলা সূর্যের মতো তেজোদীপ্ত হয়ে উঠুক। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পরাধীন ব্রিটিশ ভারতের এক চরম উন্মত্ততা আর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ প্রতিবেশ। এই শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া বঙ্গভঙ্গ, স্বদেশী আন্দোলন, সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভাজনের ভেদবুদ্ধি তৈরি হতে থাকে। পরবর্তী সময়গুলোতে তা আরও ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করে মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনগ্রন্থিকে আলগা করে দেয়।

বিভিন্ন সমাজ গবেষক, ইতিহাসবিদ, পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ এমন অসম সমাজ ব্যবস্থার জন্য সিংহভাগ দায়ভাগ চাপিয়েছেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকচক্রের ওপর। সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্কস বলেন, ‘সুদূর পুরাকাল থেকে উনিশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার চেহারা অপরিবর্তিত থেকেছে। বহু রাজবংশের ভাঙ্গা-গড়ার মাঝেও এসব সংগ্রাম, অভিযান, দ্বন্দ্ব, কলহ কখনই তার উপরিভাগের নিচে নামেনি।’ সঙ্গত কারণে মূল সামাজিক বলয়ের অচলায়তন এক জায়গায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলিষ্ণুতাও খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়। ব্রিটিশরাই প্রথম জাতি যারা এই অচল, অনড় সমাজ কাঠামোতে গতিশীলতার সঞ্চার করে। আর সেই কারণে মার্কস বলেন, স্থবির ভারতীয় সমাজকে নাড়া দেয়ার জন্য ব্রিটিশ ছিল ইতিহাসের অচেতন অস্ত্র।

কিন্তু পুরনো সমাজে নতুন ব্যবস্থাপনার যে অসম প্রক্রিয়া সেখানে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবন হয়েছে লড়াই, সংগ্রাম, হানাহানি আর সংঘর্ষের এক বীভৎস দুঃসময়। প্রাক ব্রিটিশ ভারতে কঠোর বর্ণাশ্রম প্রথার কারণে মানুষে মানুষে অবাধে মেলামেশা ছিল না সেটা যেমন ঠিক; পাশাপাশি বিবাদ, কলহ, হানাহানি কিংবা মারামারি কোন কিছুই দেখা যায়নি। ব্যবধান ছিল কিন্তু কোন ধরনের দাঙ্গা বলতে যা বোঝায় তেমন সঙ্কটাপন্ন অবস্থার অনুপস্থিতিতে ভারতীয় সম্প্রদায়গত যে ঐক্য সেখানেও বিন্দুমাত্র আঘাত আসেনি। দিল্লী সিংহাসনে মুঘল, পাঠান, তুর্কী, আর্য-অনার্যের আধিপত্য বিস্তারে সম্প্রীতির বন্ধন মূলত সংহতই হয়েছে। যদিও রাষ্ট্র ছিল অসংহত। কারণ, রাজবংশের পর রাজবংশ তাদের ক্ষমতার লড়াই, আভিজাত্যের অহঙ্কার, ব্যক্তিত্বের সংঘাতে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শাসকবর্গের নিয়মমাফিক পরিবর্তনেও সুবিশাল সামাজিক অবয়বে কোন ফাটল দৃশ্যমান হয়নি। সেই ১৭৫৭ সালে ক্লাইভের হাতে বাংলার পতন সারা ভারতবর্ষের জন্য এক অশনিসঙ্কেত।

পুরো ভারতবর্ষকে কব্জা করতে ব্রিটিশদের আরও একটি শতক অপেক্ষা করতে হয়। তারও আগে বাংলার ভূমি ব্যবস্থার ওপর ব্রিটিশ উপনিবেশের যে করাল নিষ্পেশন তাতে করে অনেক অভিজাত শ্রেণীর তাদের সহায়সম্পদ হারাতেও সময় লাগেনি। সূর্যাস্ত আইনের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। ফলে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নামে মালিকানাভিত্তিক যে জমিদার শ্রেণী তৈরি করে সেখানে শুধু অর্থনৈতিক দুর্যোগ নয় পুরো সমাজ সংস্কার এবং সংহতির ওপরও আসে এক অযাচিত দুরবস্থা। অত্যন্ত কূটকৌশলে যে নতুন জমিদারি প্রথার সৃষ্টি সেখানে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় জমিদারি দেয়া হয় হিন্দু ভূস্বামীদের। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু অঞ্চলে ভূসম্পত্তি পায় মুসলমানরা। কতখানি সূক্ষ্ম আর তীক্ষ্ম ভেদবুদ্ধিতে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা হয় যেখানে জমিদার যে প্রজাশোষণ করে তা হয়ে যায় হিন্দু দ্বারা মুসলমান শোষণ আর মুসলমান দ্বারা হিন্দু নিপীড়ন। যার মহাদুর্ভোগ থেকে আজও আমাদের পরিত্রাণ মেলেনি। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ ’৪৭-এর দেশ কর্তন পর্যন্ত চলে তারই সুদূরপ্রসারী প্রভাব। সম্প্রদায়গত সম্প্রীতিতে চিড় ধরে। সঙ্গত কারণে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভয়ঙ্কর বীজ বপিত হতেও অপেক্ষা করতে হয়নি।

তেমন ক্রান্তিকাল অতিক্রমের দুঃসহ যাত্রায় ১৮৬১ সালে কবিগুরু রবীন্দ্র নাথের জন্ম। দীর্ঘ জীবন পাওয়া বিশ্বকবি বিংশ শতাব্দীর চার দশক পর্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে অবলোকন করেন হিন্দু-মুসলিমের বিভাজন, সংঘর্ষ আর হানাহানির চরম দুর্যোগ। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে তো মানতেই পারলেন না। সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন অবস্থায় তাকে দেখা গেছে স্বদেশী আন্দোলনের সাংঘর্ষিক কর্মপ্রক্রিয়ায়। যার প্রাথমিক ছাপ পড়ে ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে। জীবনের শেষ উপন্যাস ‘চার অধ্যায়ে’ও কবিগুরু স্বদেশী আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট কোন পথপরিক্রমা চিহ্নিত করতে পারেননি। বলেছিলেন, উদ্দেশ্যহীন ভুল পথ আর মূল্যবান জীবন কখনও এক সুতায় গাঁথা হতে পারে না। কত সম্ভাবনাময় তরুণ জীবন উৎসর্গিত হয়েছে স্বদেশী আন্দোলনের সাংঘর্ষিক কার্যকলাপে। তা ছাড়া কত নিরীহ, দেশপ্রেমিক, জনদরদী নেতা ব্রিটিশ রাজশক্তির রোষানল আর অবিচারের শিকার হয়েছে। ধর্মীয় উন্মত্ততাও ভীষণভাবে আহত করে রবীন্দ্রনাথকে। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে বলেন, যে দেশে শুধু ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায় অন্য কোন বাঁধন তাকে বাঁধতে পারে না সে দেশ হতভাগ্য। মানুষের সঙ্গে মানুষের সহজ মিলন সেটাই সবার জন্য মঙ্গল। ধর্ম যেখানে সেই শুভসঙ্কেতকে বিঘ্নিত করে রাষ্ট্র কি তা রক্ষা করতে পারে? আসলে পারে না। দ্বিজাতিতত্ত্বের বিবদমান ভিত্তিতে ’৪৭-এর দেশ বিভাগ মাত্র ২৪ বছরের মাথায় পরাভূত হতে বাধ্য হয়। প্রসঙ্গত শ্রদ্ধাভাজন ও যশস্বী সাংবাদিক জীবন্ত কিংবদন্তি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর একটি বক্তব্য স্মরণীয়। স্বাধীনতার কিছু পরে ‘রক্তাক্ত বাংলা’ নামে একটি প্রবন্ধ সঙ্কলন প্রকাশ পায় ড. এআর মল্লিকের সম্পাদনায়। সেখানে তিনি ‘দ্বিজাতিতত্ত্বের অপঘাতে মৃত্যু’ নামে একটি চমৎকার লেখনিতে বলেনÑ সে ইউরোপের রাজন্যবর্গ একদা ধর্মযুদ্ধের বর্ম এঁটে পশ্চিমা দেশগুলোতে যে বিভীষিকাময় তা-ব চালায় তারাই ভারতবর্ষে আস্তানা গেড়ে ভিত্তি সুসংহত করতে ধর্মীয় বিভাজনের বীজ রোপণ করে। আর এটাই পাক-ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন ধর্মের সম্প্রীতির বন্ধনে অশনিসঙ্কেত দ্বিজাতিতত্ত্বের গোড়া পত্তন।

আর বিংশ শতাব্দীর শুরুটা ছিল সেই ভয়াল উন্মত্ততার সর্বগ্রাসী এক আতঙ্কিত পর্যায়। বঙ্গবন্ধু বেড়ে উঠেছেন সেই সহিংস উত্তাল স্রোতের বিক্ষুব্ধ পরিবেশে। কাছ থেকে হিন্দু-মুসলমানের সঙ্কট, দূরত্ব প্রত্যক্ষ করে বড় হয়েছেন। স্পষ্টভাবে অনুধাবন করেন মুসলমানদের প্রতি ব্রিটিশ রাজন্যবর্গের বৈষম্যমূলক আচরণ। পাশাপাশি মুসলমানদেরও প্রথম থেকে ইংরেজী শিক্ষায় ঔদাসীন্য, পাশ কাটানো। ফলে মুসলমানদেরও সময় লেগেছে ব্রিটিশ রাজশক্তিকে তাদের যোগ্যতা ও ক্ষমতা প্রদর্শন করতে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ সুস্পষ্টভাবে বলতে দ্বিধা করেনি টুঙ্গিপাড়ার গ্রামীণ অঞ্চলে ইংরেজী বিদ্যাশিক্ষা শুরু হওয়ার কথা। সেটা বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠার পেছনে ইংরেজ প্রবর্তিত আধুনিক শিক্ষাও নিয়ামকের ভূমিকায় কাজ করেছে। পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলয়কে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা বঙ্গবন্ধুর মনে হতো হিন্দু জমিদাররা কিভাবে মুসলমান প্রজাদের শোষণ আর বঞ্চনার শিকার করছে। তেমন বোধ থেকে কোন এক সময় দ্বিজাতিতত্ত্বের মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়া। ভাবতেন সত্যিই মুসলমানদের জন্য একটি আলাদা আবাসভূমি জরুরী। ব্রিটিশবিরোধী তৎপরতায় স্বদেশী আন্দোলনের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়া এবং সুভাষ চন্দ্র বোসের ভক্ত বনে যাওয়া সেও তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহের এক অনিবার্য গতি-প্রকৃতি। তবে জীবনভর মনেপ্রাণে, চেতনায় ছিলেন অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি ধারণ করা এক বলিষ্ঠ প্রাণপুরুষ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে লালন করতে গিয়ে কোন উন্মাদনা, দাঙ্গা, রক্তস্নাত পরিবেশকে কখনও মানতে পারতেন না। ১৯৪৬ সালের শেষ প্রান্তে আর ’৪৭-এর সূচনা পর্বে যে উন্মত্ত সহিংসতা সারা ভারতকে উত্তাল করে তোলে তেমন বিভীষিকাময় ঘটনাপ্রবাহ বঙ্গবন্ধুকে কখনও স্বস্তি আর শান্তি দিতে পারেনি। ফলে দ্বিজাতিতত্ত্বের মোহ কাটতেও সময় লাগেনি। ১৯৪৮ সালেই পাকিস্তানী নয়া ঔপনিবেশিক শাসকচক্রের হীন স্বার্থ বুঝতে পেরে সেখান থেকে নিজেকে আলাদা মাত্রায় অন্য আলোয় সমর্পিত হওয়ার প্রেরণাও অন্তর্নিহিত বোধেই জেগে ওঠে। নিজের অভিজ্ঞতায় প্রত্যক্ষ করেছেন নষ্ট রাজনীতির অপশক্তি। ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। ১৯৪৩ সালের দেশ কাঁপানো দুর্ভিক্ষে ব্যবসায়ীদের কূটকৌশলের কথাও বলেছেন নির্দ্বিধায়, নির্বিঘেœ। সবকিছুকে গুদামজাত করতে ব্যবসায়ীদের জনবিরোধী কার্যকলাপও মানতে কষ্ট হয়েছে। যা ‘অসাপ্ত আত্মজীবনীর‘ কলেবর সমৃদ্ধ করেছে। সে সময় ব্যবসায়ীরা নাকি দশ টাকা মণের চাল ৪০ টাকায় বিক্রি করতে সাধারণ মানুষের কথা ভাবেওনি। যার ফলে না খেয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে পথে-প্রান্তরে। তখন থেকেই বাংলার গণমানুষের প্রতিদিনের জীবন নিয়ে সব সময় ভেবে চলেছেন। জীবনের শেষ সময়টুকুও সেই সাধারণ মানুষের মানোন্নয়নে উদ্বিগ্ন আর উৎকণ্ঠায় কেটেছে।

পরাধীন ভারতে জন্ম নেয়া বঙ্গবন্ধু শৈশবকাল থেকে যে স্বাধীন মনোবৃত্তিতে নিজেকে তৈরি করতে থাকেন সেটাই এক বলিষ্ঠ দেশ নায়কের অবিচলিত মহিমা। শতবর্ষ পার করতে যাওয়া এই মহানায়ক মাত্র অর্ধশত বছরের জীবনে যা কিছু করতে পেরেছিলেন তা আবহমান বাংলার ঐতিহ্যিক পথপরিক্রমার এক যুগান্তকারী স্বর্ণ অধ্যায়। স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে যিনি নতুন উদ্যমে জাতিকে এগিয়ে নিতে যে অসাধারণ পারদর্শিতা প্রদর্শনের সূচনাকালে তাকে চলে যেতে হয় স্বাধীন মাতৃভূমি আর প্রাণপ্রিয় দেশবাসীর কাছ থেকে দূরে, বহুদূরে। ক্ষণজন্মা এই মহামানবের নির্দেশিত পথ ধরেই বাঙালী এগিয়ে যাবে উদ্দীপ্ত চেতনায় আর জোরালো কর্মযোগে। জন্মশতবর্ষে তেমন আলোকিত কর্মদ্যোতনাই মহানায়কের জন্য নিবেদিত উপহার, শুভেচ্ছা আর সশ্রদ্ধ অভিনন্দন। এমন অমর ব্যক্তিত্বের শেষ যাত্রা হয় না কখনও। তিনি যুগ যুগ ধরে, কাল থেকে কালান্তরে বেঁচে থাকবেন সর্ব বাঙালীর ইতিহাসে।

লেখক : সাংবাদিক

প্রকাশঃ দৈনিক জনকন্ঠ (১০ মার্চ ২০২০)

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত