সাংবাদিকদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছিল হৃদ্যতার সম্পর্ক

390

Published on জানুয়ারি 19, 2021
  • Details Image

বেবী মওদুদঃ

চল্লিশের দশকে শেখ মুজিব যখন কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে পড়তে যান, তখন থেকেই তিনি বাংলার ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যান। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে রাজনীতি করার। তাই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর শিষ্য হিসেবে তাঁর আদর্শের ছায়ায় তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন। বিশেষ করে তরুণ নেতা হিসেবে শেখ মুজিব সবার দৃষ্টিনন্দিত হন। এই সময় থেকে সংবাদপত্র অফিসে তাঁর যাতায়াত শুরু হয়। কলকাতার দৈনিক আজাদ অফিসে সাংবাদিক বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেন। অনেক সময় মুসলিম লীগের প্রেস রিলিজ নিয়েও যেতে হত তাঁকে। একসময় তাঁর উপলব্ধিতে আসে যে, মওলানা আকরাম খাঁ সম্পাদিত দৈনিক আজাদ মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল গ্রুপকে সমর্থন করে। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁরা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অর্থানুকূল্যে দৈনিক ইত্তেহাদ প্রকাশ করেন। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন আবুল মনসুর আহমেদ। পত্রিকাটি সেই সময়ে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে একটি আধুনিক পত্রিকা হিসেবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পত্রিকা বিক্রয়ের কাজে শেখ মুজিব নিজে পরিশ্রম করেন। পত্রিকার ভালোমন্দ এবং ব্যবস্থাপনার কাজেও তিনি একজন দায়িত্বশীল পরামর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। পাকিস্তান হবার পরও পত্রিকাটি কলকাতা থেকে প্রকাশ হত। শেখ মুজিব পত্রিকার ঢাকা অফিসে সার্কুলেশন ম্যনেজার হিসেবে কাজ করেছেন এবং পূর্ববাংলায় এজেন্ট নিয়োগ করে এর ব্যাপক প্রচারের কাজ করেছেন। একসময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত বলে এই পত্রিকার পূর্ববাংলায় প্রচার নিষিদ্ধ করে দেয় খাজা নজিমউদ্দিনের সরকার।

১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে দলের মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশিত হয়। মওলানা ভাসানী ছিলেন সম্পাদক, ইয়ার মোহাম্মদ খান ছিলেন প্রকাশক, কিন্তু পত্রিকা পরিচালনার সকল দায়িত্ব পালন করতেন তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া)। পত্রিকার অর্থসাহায্য করতেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে শেখ মুজিব এই পত্রিকা বিক্রির কাজও করেছেন ঢাকায়।

যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পূর্বে ১৯৫৩ সালে ইত্তেফাক সাপ্তাহিক থেকে দৈনিকে রুপান্তরিত হয়। আর তফাজ্জল হোসেন এর সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে পূর্ব-বাংলায় ৯২ (ক) ধারা প্রবর্তন করে রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার ও অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়। সেসময় দৈনিক ইত্তেফাকও বন্ধ ছিল। কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাত করতে গিয়ে তফাজ্জল হোসেন তাঁকে জানান, তিনি আর কাগজ বের করবেন না। করাচিতে একটা চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছেন। শেখ মুজিব তাঁকে সেদিন অনুরোধ করেছিলেন, আপনি যাবেন না। আপনি চলে গেলে ইত্তেফাক আর কেউ চালাতে পারবেন না। তফাজ্জল হোসেন পরদিন তাঁকে খবর পাঠান যে, তিনি করাচি যাচ্ছেন না।

শেখ মুজিবের সঙ্গে তফাজ্জল হোসেনের গভীর হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রথম তাঁকে শেখ মুজিবের অনুরোধে সোহরাওয়ার্দী সেক্রেটারি নিয়োগ করে পত্রিকার প্রশাসন ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের একজন পরামর্শক ছিলেন তফাজ্জল হোসেন। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব তাঁর ঐতিহাসিক ছয়দফা দাবি উত্থাপন করলে এর পক্ষে দৈনিক ইত্তেফাক জনমত গড়ে তুলে জেনারেল আইয়ুবের ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দেয়।

১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় এদেশের পত্রিকাগুলো একটি সাহসী ভূমিকা পালন করেছিল। বিশেষ করে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হয় তার শুনানি-পর্বের কোর্ট-রিপোর্টিং ধারাবাহিকভাবে দৈনিক পত্রিকাগুলোয় ছাপা হত। একদিকে ছাত্র-গণআন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, প্রত্যাহার; আবার রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে পূর্বপাকিস্তান জুড়ে প্রতিদিন মিছিল সভা-সমাবেশ। জেনারেল আইয়ুব বাধ্য হয়ে সব দাবি মেনে নিয়েছিল। ওই সময়ে পত্রিকাগুলো সংবাদ, কলাম ও সম্পাদকীয় লিখে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর শোষণ-নির্যাতন-বৈষম্যের কথাগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরেছিল। পরবর্তীতে সত্তরের নির্বাচন ও একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের সময়েও দৈনিক পত্রিকাগুলোও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছিল। তারা শেখ মুজিবের সকল সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা, বিবৃতি ও ভাষণ ছবিসহ প্রথম পৃষ্ঠায় বড়-বড় টাইপে ছাপাত। বলা চলে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে, জনমানস গড়ে তুলতে পত্রিকাগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। শেখ মুজিবের নেতৃত্বের পক্ষে পূর্ণ সমর্থন রেখেছে। মানুষকে সচেতন করে তোলার যথার্থ কাজটি তখন পত্রিকাগুলো করেছে।

শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ভাষণের পর থেকে বাঙালির স্বাধীনসত্তা প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আর কোনো প্রশ্ন তখন কেউ তোলেনি। সমগ্র জাতি হয়েছিল একাত্ম। দৈনিক সংবাদপত্রগুলোয় শেখ মুজিবই ছিলেন অবিসংবাদিত নেতা, তাঁর নেতৃত্বই ছিল গ্রহণযোগ্য। মওলানা ভাসানীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবকে পূর্ণ সমর্থনদান করেছিলেন।

২৫ মার্চ রাতের পর ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত পত্রিকাগুলো পাক-সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা মেনে প্রকাশ হত। ওই সময় দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ পত্রিকাদুটি দীর্ঘ নয়মাস প্রকাশনা বন্ধ রেখেছিল। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের সংবাদ নিয়ে আবার তারা আগের মত সাহসী ভূমিকা পালন করে। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ‘ঐ মহামানব আসে’ হিসেবে পত্রিকাগুলো আখ্যায়িত করে। শেখ মুজিব বাঙালি জাতির পিতার মর্যাদায় সংবাদপত্রে স্থান করে নিলেন। শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা দেশ ছাড়িয়ে সারাবিশ্বে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর নেতৃত্বের কারিশমা বিশ্বনেতার সম্মানে অধিষ্ঠিত।

মাত্র সাড়ে তিন বছর প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিব দেশ শাসন করেন। তবু সেই সময় ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে তিনি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করালেন। তবে এজন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য-সহযোগিতা ছিল, দেশের মানুষও পরিশ্রম করেছে প্রচুর। বিধ্বস্ত ব্রিজগুলো নির্মাণ, ফেরী জোগাড় করে পরিবহনব্যবস্থা উন্নত, সমুদ্রবন্দরকে স্থলমাইন মুক্ত করা, অস্ত্র সমর্পণ করানো, ভারতীয় সৈন্যদের ফেরত পাঠানো, কৃষি উৎপাদনে উদ্যোগ গ্রহণ, প্রশাসনকে গতিশীল করা ইত্যাদি নানা কাজে সবসময় উদ্যোগী ও আন্তরিক ভূমিকা নিয়েছেন। আর এসময় থেকে কোনো কোনো পত্রিকা ও সাংবাদিক শেখ মুজিবের বিরুদ্ধাচারণ, সমালোচনামূলক লেখা শুরু করে। তারা তাঁর দেশশাসনের ন্যূনতম ভূল-ত্রুটিকে তীক্ষ্ণভাবে আক্রমন করেছে।
পরবর্তীতে যখন বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠিত হল তখন ওই সাংবাদিকরাই শেখ মুজিবের পরামর্শক হয়ে উঠলেন। তাদের পরামর্শে দেশে মাত্র চারটি বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক প্রকাশনা রেখে অন্যসব কাগজ বন্ধ করে দেয়া হয়। সাংবাদিকদের সরকারি চাকরি দেয়া হয়েছিল। চাকরি না-হওয়া পর্যন্ত সবাইকে বেতন দেয়া হত। অথচ ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘাতকের বুলেটে নিহত হবার পর এসব পরামর্শক সাংবাদিকরা তাঁর সমালোচলায় মুখর হয়েছে। তারা জেনারেল জিয়ার পাকিস্তানি স্টাইলে দেশশাসন ও একাত্তরের ঘাতক-দালালদের প্রশ্রয়কে সমর্থন করেছে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে শেখ মুজিবের একটা হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। তিনি নামে জানতেন অনেককে। এদের কাছ থেকে অনেক তথ্য ও খবর পাওয়া সম্ভব ছিল বলে কেউ কেউ খুব সহজেই তার কাছে পৌঁছে যেতেন। দেশ-বিদেশে যেখানে যখন সফরে গিয়েছেন একদল সাংবাদিক তাঁর সঙ্গে থাকছেই। তিনি সাংবাদিকদের কাছ থেকে মতামত নিতেন। বিদেশী সাংবাদিকরা তাঁর সাক্ষাতকার নেওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতেন। তাঁদের কাছে তিনি একজন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের জন্য লন্ডন টাইমস্ ও নিউইয়র্কের নিউজ উইক পত্রিকা তাঁকে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ আখ্যায়িত করেছিল। এটা এক বিরল সম্মান। ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুর একটি দীর্ঘ সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছিলেন। ভয়েস অফ আমেরিকা ও বিবিসি’র বাংলা বিভাগ সরাসরি শেখ মুজিবের সাথে যোগাযোগ করে তাঁর সাক্ষাতকার ও মন্তব্য নিত।

সাংবাদিকদের সাথে বঙ্গবন্ধুর হৃদ্যতার সম্পর্ক থাকলেও তিনি যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখনও কিছু কিছু পত্রিকা তাঁর সমালোচনা করে খবর ও কলাম প্রকাশ করত। তবে তারা তাঁর ব্যক্তিত্ব, সাহসিকতা, দূরদর্শিতার প্রশংসা করতেও বাধ্য হত। তিনি সাংবাদিকদের স্বাধীনচেতা হিসেবে দেখতে চাইতেন, কিন্তু পাশাপাশি দেশ ও জাতির স্বার্থকে বড় করে দেখার পরামর্শ দিতেন। তাদের বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে গঠনমূলক সমালোচনা করার আহ্বান জানাতেন। তিনি সংবাদপত্রশিল্পকে অত্যন্ত মর্যাদার আসন দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধকালে ক্ষতিগ্রস্ত দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ পত্রিকাদুটিকে পুনরায় নিজের পায়ে দাঁড় করাতে সবরকম সহযোগিতা করেছিলেন।

সংবাদপত্র-সাংবাদিক ও শেখ মুজিব একটি সুতোয় গাঁথা অতিঘনিষ্ট সম্পর্ক বাঙালি জাতির মুক্তির ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে।

সূত্রঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবার- বেবী মওদুদ, পৃষ্ঠা নং- ৬৪-৬৮

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত