স্মৃতিময় ও গর্বের মার্চ মাসঃ মাহবুবা আহসান

1704

Published on মার্চ 25, 2018
  • Details Image
এখন চৈত্র মাস। বসন্তের শেষ অংশ। বাংলা বছরেরও শেষ দিক। কুহুকুহু ডাকে চারদিক মুখরিত করে তুলছে কোকিল। মার্চ মাস আমাদের গর্বের মাস। প্রত্যেক দেশেরই জাতীয় জীবনে বিশেষ কতগুলো গৌরবজনক দিন, মাস অত্যুজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করে। অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে সেসব দিবস উদযাপিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস এমনই একটি পবিত্র মর্যাদাপূর্ণ দিবস। শ্রদ্ধা, গর্ব ও আনন্দের সঙ্গে এ দিনটিকে আমরা প্রতিবছর জাতীয় মর্যাদায় উদযাপন করি। ত্রিশ লাখ বাঙালির জীবন সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশ তাই আমাদের যক্ষের ধন। প্রতি বছর এ দিনটি এলে বাংলার মানুষ আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে।

 

আমরা আজ স্বাধীন। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা যে গৌরব বোধ করি, এ গৌরব অর্জনের পেছনে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম এবং ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিদ্যমান। মনে পড়ে ২৫শে মার্চের কালোরাত্রি। চারদিকে এতো গোলাগুলির শব্দ, পাশের জনের সাথে কথা বললেও শোনা যাচ্ছে না। খাটের নিচে উপুড় হয়ে শুয়ে আছি। রাত শেষের দিকে এক পর্যায়ে গোলাগুলির শব্দ থেমে আসে। সকালে দরজা খুলে সবার সাথে আমিও বেরিয়ে আসি। প্রচণ্ড যুদ্ধঝড়ের তাণ্ডবলিলায় মানুষ যে যেভাবে পারে জীবন বাঁচানোর জন্য এদিক-ওদিক দৌড়ে পালানোর সময় কাপড়-চোপড় ও বিভিন্ন জিনিসপত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়। মনে হলো আশ-পাশে কেউ নেই। ভয়াবহ নীরবতা, স্তব্ধতা যেন সবকিছু গ্রাস করে নিচ্ছে।

 

মনে পড়ে সেদিনের কথা। বাবা ও বড় ভাই যুদ্ধে গেছেন। মা, বড় বোন ও ছোট দুই ভাই বাসায়। সামনে মিলিটারী ক্যাম্প। চারদিকে নিস্তব্ধ ভাব। ভয়ে যেন বুক কাঁপে। আশ-পাশের সবাই বাড়ি-ঘর ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। এতে করে আরও যেন নীরব ভয়াবহতা ঘনীভূত রূপ ধারণ করেছে। লাইনে পানি নেই। মিলিটারী ক্যাম্পের সামনেই একটি চাপকল। বালতি হাতে ছোট ছোট পা-পা করে হেঁটে যাই চাপকলের পাশে। ভরা বালতি নিয়ে অতি কষ্টে যখন বাসার  কাছে আসি তখন দেখা যায় হাঁটুর সাথে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে বালতির অর্ধেক পানিই মাটিতে পড়ে গেছে। এভাবে কয়েকবার ছোট বালতি দিয়ে পানি এনে বড় বালতিটি ভরতে সক্ষম হই। কারণ সারা দিন এ পানি দিয়েই রান্না-বান্নাসহ সব কাজ চালাতে হবে। এ ধরনের নানা স্মৃতি এ দিনটি এলেই মনে করিয়ে দেয়। দেশকে মুক্ত করার লক্ষ্যে যারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে যুদ্ধ করেছেন তারাই তো মুক্তিযোদ্ধা। আমার বয়স তখন সাত/আট বছর হবে। যুদ্ধবিমান যখন সাঁই সাঁই করে উড়ে যেত, মা বারণ করা সত্ত্বেও দৌড়ে ছাদে যেতাম। প্রতিদিন নিস্তব্ধ রাতের আঁধারে বুটের খট খট আওয়াজে বুকের ভিতরটা হিম হয়ে যেত। মনে পড়ে রাতের বেলায় হারিকেনটা নিভু নিভু করে খাটের তলায় রেখে দিতেন মা। জানালার কাঁচ ভেদ করে আলো যাতে বাইরে না যায় তার জন্য কাগজের পট্টি দিয়ে আঠা লাগিয়ে দিতেন।

 

২৫শে মার্চের সেই মর্মান্তিক গণ-হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত  প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এ দেশের অগণিত মানুষ, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সকলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফলে বিজয় আমাদের ললাটে জোটে। ত্যাগ করতে হয়েছে অনেক কিছু। এতো ত্যাগ আর বিসর্জনের পর স্বাধীন যে বাংলাদেশ গড়ে ওঠেছে, তাকে সমুন্নত রাখা আজ আমাদের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। এতো কষ্ট ও ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীন বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার পথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রেরণা অবশ্যই আমাদের সাহস যোগাবে।

সৌজন্যেঃ ইত্তেফাক 

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত