১৭ই মে, আমাদের ঘুরে দাঁড়াবার দিন

9004

Published on মে 16, 2020
  • Details Image

ডাঃ সাদমান সৌমিক সরকার (নিশম):

১)
দিল্লীর ইন্ডিয়া গেটের পাশেই পান্ডারা পার্ক। সেখানকার সি-ব্লকে এক নতুন পরিবার এসে উঠেছে। দেখতে আর দশটা পরিবারের মতো হলেও, কিছু একটা গড়বড় আছে নিশ্চয়ই, কারণ তাদের সাথে সব সময় দুইজন গার্ড দেখতে পাওয়া যায়। বিষন্ন মুখে ২৮ বছর বয়সী এক তরুনীকে সেখানে দেখা যায়। সাদা মাটা একটা ফ্ল্যাট, অল্প কিছু আসবাবপত্র। দিন কাটাবার জন্য পরিবারটিকে একটি টেলিভিশন দিয়েছে ভারত সরকার। সেখানে দিনে দু ঘন্টা দুরদর্শন প্রচারিত হতো। পরিবার হারিয়ে রেফুজির জীবন কাটানো মেয়েটি তখন সদ্য জানতে পেরেছে, শুধু বাবা আর ভাইয়েরা নয়, মা আর ছোট ভাই রাসেলকেও হত্যা করা হয়েছে। পৃথিবীটা এতো দ্রুত তার জন্য এতো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, সে কখনও ভাবতে পারেনি।
ভারতে আসবার পরে তাকে তার বোন আর স্বামী-সন্তান সহ লাজপাত নগর এর ৫৬ রিং রোডে একটি ছোট বাসায় থাকতে দেয়া হয়েছিলো, সেফ হোম হিসেবে। ১০দিন পর্যন্ত মেয়েটির মনে ক্ষীন আশা ছিলো, হয়তো মা আর রাসেলকে ওরা মারেনি। ১০দিন পরে ৪ঠা সেপ্টেম্বর সফদরজং রোডে ইন্দিরা গান্ধীর বাসবভনে পৌছান রাত ৮টায়। ১০ মিনিট পরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এসে মেয়েটির পাশে বসেন। তাকে জিজ্ঞেস করেন, ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে সে পুরোপুরি অবগত কি না। মেয়েটি শুন্য চোখে তাকিয়ে থাকে। তার স্বামী বলেন, রয়টার্স আর ব্রিটিশ মিশন কর্তৃক প্রচারিত দুইটি ভাষ্য ছাড়া তারা তেমন কিছু জানেন না। ইন্দিরা গান্দী তাঁর এক কর্মকর্তাকে জানান, উপস্থিত সকলকে সম্পুর্ণ ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করতে। কর্মকর্তাটি পুরো ঘটনা বলবার মধ্যে বলে উঠলেন যে বেগম ফজিলাতুন্নেসা ও রাসেলও জীবিত নেই। মেয়েটি কান্নায় ভেঙ্গে পরে, শেষ আশাটুকুও নিভে যায় তার। ভগ্ন হৃদয়ে ইন্দিরা গান্ধী তাকে জড়িয়ে ধরেন। তাকে বলেন, ‘তুমি যা হারিয়েছো, তা কোনভাবেই পুরণ করা যাবে না। তোমার একটি শিশু ছেলে ও মেয়ে আছে, এখন থেকে তোমার ছেলেকেই তোমার আব্বা, তোমার মেয়েকেই তোমার আম্মা হিসেবে ভাবতে হবে। তোমার ছোট বোন ও তোমার স্বামী রয়েছে তোমার সঙ্গে। তোমার ছোট বোন, ছেলেমেয়েকে মানুষ করবার দায়িত্ব তোমার, তোমাকেই নিতে হবে। এখন তোমার কোন অবস্থাতেই ভেঙ্গে পরলে চলবে না।‘
১৯৭৩ সালে গ্রাজুয়েশন শেষ করা সদ্য তরুণীটি, যার আকাশ জয়ের স্বপ্ন তখন চোখে, সব হারিয়ে রেফুজি হয়ে বিদেশে ঘুরে বেড়ানো সেদিনের মেয়েটির নাম শেখ হাসিনা। তার বাবা, বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদরের বড় মেয়ে, হাসু।

২)
শেখ হাসিনা যখন ভারতে এসে পৌছান, ভারতে তখন জরুরী অবস্থা বিরাজমান। শেখ হাসিনার বাড়ির বাইরে সব সময় দুইজন বডি গার্ড থাকেন, একজন ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে নিয়ে আসা সত্য ঘোষ, আরেকজন পি কে সেন। এই দুইজন অফিসার ছায়ার মতো শেখ হাসিনার সঙ্গে থাকতেন। এছাড়াও, শেখ হাসিনার একজন এসিসট্যান্ট ছিলেন, যার নাম এ এল খতিব। এ এল খতিব এর আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি একটি বই লিখেছিলেন, ‘Who Killed Mujib?’ শিরোনামে, যেটি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে অত্যন্ত মুল্যবান একটি দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
আজকের চানক্যপুরীতে বাংলাদেশ হাই কমিশন প্রতিষ্ঠার পুর্বে, ভারতে বাংলাদেশ হাই কমিশন ছিলো লাজপাত নগরে, সেই লাজপাত নগর, যেখানে শেখ হাসিনা প্রথম আশ্রয় নিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ব্রাসেলস থেকে ওয়াজেদ পরিবার ও শেখ রেহানা, তাদের প্যারিস যাবার কথা। আগের দিন গাড়ির দরজায় ডক্টর ওয়াজেদ এর হাত চিপে গিয়েছিলো। এমতাবস্থায় তারা চিন্তাভাবনা করছিলেন যে তারা প্যারিস যাবেন কি না। ভোর তখন ৬টা। ওয়াজেদ মিয়ার ঘুম ভাঙ্গে হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর ফোনে। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তখন জার্মানির বনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। সানাউল হকের স্ত্রীর ডাকে ওয়াজেদ সাহেব ফোন ধরলেন। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী জানালেন, বাংলাদেশে একটি মিলিটারি ক্যু হয়েছে, তারা যেনো এখন প্যারিস না যায়। বরং তখুনি যেনো জার্মানী চলে আসেন। সানাউল হক, তৎকালীন বেলজিয়ামে নিযুক্ত বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত, মুহুর্তের মধ্যে ভোল পালটে ফেললেন। মিলিটারি ক্যুতে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত, এ খবর পাওয়া মাত্র তিনি শেখ হাসিনা, ওয়াজেদ মিয়া, শেখ রেহানা সহ পুরো পরিবারটিকে কোন ধরণের সাহায্য সহযোগীতা করতে অস্বীকার জানালেন, এমন কি তাদের ঘর থেকেও চলে যেতে বললেন। একটি গাড়ি ম্যানেজ করে দিতে বললে, তিনি সেটিতেও অস্বীকৃতি জানান।
সকাল সাড়ে দশটায় তারা ব্রাসেলস ছেড়ে জার্মানীর বন শহরের দিকে যাত্রা শুরু করেন। এই যাত্রা এক অনন্তের পথে যাত্রা। এই যাত্রা এক অজানার পথে যাত্রা। তারা তখনও জানে না, কেউ নিহত হয়েছে কি না আসলেও, হলেও কে কে, কেউ জীবিত আছে কি না, তাদেরই বা ভবিষ্যত কি! বিকেল সাড়ে টায় তারা বন শহরে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর বাড়িতে এসে পৌছান। আধা ঘন্টা পরে ডঃ কামাল হোসেনও সেখানে এসে পৌছান, তিনি তখন বাংলাদেশের পররাষ্টমন্ত্রী, যুগোশ্লোভিয়া সফরে এসেছিলেন। ডঃ ওয়াজেদ হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীকে নিয়ে বাইরে চলে আসেন, তাকে নিশ্চিত করেন যে নিরাপদ স্থানে না পৌছানো পর্যন্ত হাসিনা ও রেহানাকে কিছু জানানো হবে না, তাকে যেনো সত্য জানানো হয়, হুমায়ূন সাহেব তাকে জানান, বিবিসির এক ভাষ্যানুসারে বেগম মুজিব ও রাসেল ছাড়া সবাইকে হত্যা করা হয়েছে, আর ব্রিটিশ মিশন প্রচার করেছে যে কেউই বেঁচে নেই।
১৬ আগস্ট, ডঃ কামাল হোসেন লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা কালে ওয়াজেদ মিয়া তাকে বিদায় জানাতে বন বিমানবন্দরে যান। তিনি কামাল হোসেনের হাত ধরে বলেন, ‘খন্দকার মোশতাক খুব সম্ভবত আপনাকে পররাষ্টমন্ত্রী রাখার চেষ্টা করবেন। অনুগ্রহ করে আমার কাছে ওয়াদা করুন, আপনি কোন অবস্থাতেই তার সঙ্গে আপোষ করে তার মন্ত্রী পরিষদে যোগদান করবেন না।‘ জবাবে কামাল হোসেন বলেন, ‘ডঃ ওয়াজেদ, প্রয়োজনে আমি বিদেশের মাটিতেই মৃত্যুবরণ করতে রাজী আছি। কিন্তু কোন অবস্থাতেই মোশতাক আহমেদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আপোষ করে আমি দেশে ফিরতে পারি না।‘
ডঃ কামাল হোসেনকে শেখ হাসিনা ১৬ আগস্টে অনুরোধ করেছিলেন, একটি পাবলিক স্পীচ দেবার জন্য কিংবা প্রেস কনফারেন্স করবার জন্য, তিনি তা করেননি।
৩)
হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার নিরাপত্তা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, তারা যদি পৃথিবীর কোথাও নিরাপদ থাকে, সেটি ভারত। তিনি পশ্চিম জার্মানিতে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মিঃ ওয়াই কে পুরীর সাথে দেখা করলেন। মিঃ পুরী জানালেন, ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় পাবার প্রক্রিয়াটি খুবই দীর্ঘ এবং জটিল। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর পছন্দের দুইজন পরামর্শদাতা ডি পি ধর এবং পি এন হাক্সর এর সাথে যোগাযোগ করবার পরামর্শ দেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে, দুর্ভাগ্যবশত দুজনই তখন ভারতের বাইরে অবস্থান করছিলেন। জনাব চৌধুরী খুবই দ্বিধাগ্রস্ত বোধ করতে লাগলেন, কারণ একমাত্র সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীকে ফোন করা ছাড়া তার আর কোন উপায় ছিলো না। ইন্দিরা গান্ধী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, আর তিনি বাংলাদেশের একজন সাধারণ রাষ্ট্রদূত। তাছাড়াও, ভারতে যখন জরুরী অবস্থা বিরাজমান। মিঃ পুরীর থেকে নাম্বার নিয়ে তিনি একদিন ফোন দিলেন, শেষ চেষ্টা হিসেবে। সৌভাগ্যই বলতে হবে, ফোন অপারেটর না, বরং ইন্দিরা গান্ধী নিজেই সেদিন ফোনটি রিসিভ করেছিলেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী পুরো ঘটনা খুলে বলা মাত্র ইন্দিরা গান্ধী এক বিন্দু সময় নষ্ট না করে বললেন, শেখ মুজিবের দুই কন্যা ও তার পরিবারকে যতো দ্রুত সম্ভব ভারতে পৌছাবার ব্যবস্থা করতে। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সময় নষ্ট না করে ওয়াজেদ মিয়াকে নিয়ে ভারতীয় দুতাবাসে নিয়ে যান। ওয়াজেদ মিয়ার সাথে তখন তেমন কোন অর্থ কড়ি ছিলো না। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশ থেকে মাত্র ২৫ ডলার সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী তাদেরকে হাজারখানেক জার্মান মুদ্রা প্রদান করেন। ২৪ আগস্ট সকাল ৯টায় পরিকল্পনা অনুযায়ী দুতাবাসের কর্মকর্তা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাদেরকে ফ্র্যাংকফুর্ট বিমানবন্দর নিয়ে যান, একটি এয়ার ইন্ডিয়া বিমানে করে তারা সকাল সাড়ে ৮টায় দিল্লীর পালাম বিমানবন্দর পৌছান। শুরু হয় শেখ হাসিনার রেফুজি জীবন। শেখ রেহানার দ্বাদশ শ্রেণিতে পরীক্ষা দেবার কথা ছিলো, কিন্তু পারলেন না। তাকে ’৭৬ সালে শান্তিনিকেতনে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেয়া হলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে নৈনিতাল এর সেইন্ট জোসেফ স্কুল এ ভর্তি করানো হয়। পরবর্তীতে তামিল নাড়ুর কোদাইকানাল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে সে পড়াশুনা করে। পরে ব্যাংগালোর ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স এ পড়াশোনা শেষ করে ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসে এ উচ্চতর পড়াশুনা করতে যান। স্বামী ডঃ ওয়াজেদ মিয়াকে ’৭৫ এর ১লা অক্টোবর পরমানু শক্তি বিভাগে ফেলোশিপ প্রদান করা হয়। ’৭৬ এর ২৪শে জুলাই, ছোটবোন শেখ রেহানার বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়, পাত্র লন্ডন প্রবাসী শফিক সিদ্দিকের সাথে। কিন্তু সে বিয়েতে শেখ হাসিনা ও তার স্বামী ওয়াজেদ মিয়া নিরাপত্তাজনিত কারণে অংশ নিতে পারেননি।
ভারতে সে সময় শেখ হাসিনার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন সে সময়কার ডেপুটি মিনিস্টার মিঃ প্রণব মুখার্জি আর তার স্ত্রী শ্রীমতি শুভ্রা মুখার্জি। তারা শুধু দেখা সাক্ষাতই নয়, বরং হাসিনা পরিবারকে পিকনিকেও তাদের সাথে নিয়ে যেতেন। বলা যায়, পরিবারের বাইরে প্রণব-শুভ্রা পরিবারটি হয়েছিলো, হাসিনাদের সবচেয়ে আপনজন।
’৭৭ এর নির্বাচনে হেরে ইন্দিরা গান্ধী তার প্রধানমন্ত্রীত্ব হারান। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আসেন মোরারজী দেশাই। শেখ রেহানাকে ভারতে ফিরিয়ে আনবার জন্য ডঃ ওয়াজেদ মিয়া ও শেখ হাসিনা ১৯৭৭ সালে মোরারজী দেশাইর এর সাথে সাক্ষাত করেন। তিনি রেহানাকে ভারতে ফিরিয়ে এনেছিলেন ঠিকই। তবে আস্তে আস্তে তিনি হাসিনার উপর থেকে হাত গোটাতে শুরু করেন। প্রথমে ফ্ল্যাটের বিদ্যুতের বিল যেটি সরকার দিতো, সেটি বন্ধ করে দেয়া হলো। গাড়ির ব্যবস্থা তুলে নেয়া হলো। ডক্টর ওয়াজেদ এর ফেলোশিপ এর সময়ও তখন শেষ, প্রচন্ড আর্থিক কষ্টে তখন ওয়াজেদ পরিবার। এক বছরের জন্য ফেলোশিপ বাড়াবার আবেদন করলে দেশাই সরকার ৩ মাস কোন উত্তর জানাননি, যদিও পরে ঠিক এক বছরের জন্য ফেলোশিপ বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে আবারও ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফিরে আসেন, সে বছর শেখ হাসিনা সন্তানদের নিয়ে লন্ডনে যান তার বোনের কাছে। ইতিহাসে ১৯৮০ সালটা খুব গুরুত্বপুর্ণ এই কারণে, কারণ এই বছরেই শেখ হাসিনা প্রথম পাবলিক স্পীচ প্রদান করেন, তারিখটা হলো ১৬ই আগস্ট, ১৯৮০। স্থানঃ ইয়র্ক হল, লন্ডন। শেখ হাসিনার রাজনীতিতে সাহসিক আগমনের আগামবার্তা এই সময়টাকে বলাই যায়, কারণে যে সময়ে তিনি পাবলিকলি স্পীচ দিয়েছেন, সে সময়ে ব্রিকলেনে যুদ্ধাপরাধীরা ছুরি হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো হাসিনাকে হত্যা করবার জন্য।
৪)
১৯৮০ সালে, ভারতে শেখ হাসিনার বাড়িতে আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীরা আসতে লাগলেন। তারা তাকে ক্রমাগত বোঝাতে লাগলেন, তার কেনো দেশে ফেরা উচিৎ এই মুহুর্তে, তাকে শক্ত হাতে দলের দায়িত্ব নিতে হবে। শেখ হাসিনা বলতেন, আমি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে, এটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় গৌরব। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই।
একদিন স্বপ্নে তিনি তার বাবাকে দেখেন, তিনি বাবাকে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আব্বা, আপনি কোথায় আব্বা? আওয়ামীলীগ যদি ভেঙ্গে যায়, আমাদের আর কোনদিন ঘরে ফেরা হবে না’। স্বপ্নেই তার বাবা তাকে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তুই চিন্তা করিস না, আওয়ামীলীগ ভাঙ্গবে না।‘
১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারী, ঢাকায় আওয়ামীলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনে আওয়ামীলীগ তার রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্তটি নেয়, সিদ্ধান্তটি ছিলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জ্যেষ্ঠ কন্যা, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর সভাপতি নির্বাচন। সেদিন শেখ রেহানা লন্ডন থেকে ভারতে এসে শেখ হাসিনাকে খবরটি দেন। পরবর্তীতে আসে সেই মাহেন্দ্রাক্ষন, ১৭ই মে, ১৯৮১। আওয়ামীলীগের দুই নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ আর কোরবান আলীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রওনা দেন ঢাকায়। সেইদিনটি ছিলো রবিবার, বৃষ্টিস্নাত এক দিন। প্রায় পনের লক্ষ জনতা সেদিন ঢাকা বিমানবন্দরে তাকে অভিনন্দন জানাতে ছুটে আসে। দেশের মাটিতে নেমে কান্নায় ভেঙ্গে পরে শেখ হাসিনা। তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে বলেন, ‘'যেদিন আমি বাংলাদেশ ছেড়ে যাচ্ছিলাম, সেদিন আমার সবাই ছিলো। আমার মা-বাবা, আমার ভাইয়েরা, ছোট্ট রাসেল সবাই বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টে এসেছিলো। আজকে আমি যখন ফিরে এসেছি, হাজার হাজার মানুষ আমাকে দেখতে এসেছেন, স্বাগত জানাতে এসেছেন, কিন্তু আমার সেই মানুষগুলো আর নেই। তারা চিরতরে চলে গেছেন।‘ ঢাকা বিমানবন্দর থেকে তিনি তাদের বাড়ি ধানমন্ডি ৩২ এ যান, কিন্তু তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাকে সে বাড়িতে ঢুকতে বাধা প্রদান করেন। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয় যাতে শেখ হাসিনা সেই বাড়িতে না ঢুকতে পারে। তিনি রাস্তাতে বসেই সেদিন সবার জন্য দোয়া করেছিলেন। শেখ হাসিনা ধানমন্ডি লেকের পাড়ে, বাড়ির দরজার এসে বসে থাকতেন। তার নিজের বাবার বাড়ি তার জন্য নিষিদ্ধ ছিলো। ’৮২ সালে ডঃ ওয়াজেদ মিয়া বাংলাদেশ পরমানু শক্তি কমিশনে যোগদানের আবেদন জানান। মহাখালীতে দুই কামরার একটা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়েছিলো পরমানু শক্তি কমিশন, শেখ হাসিনা সেই ফ্ল্যাটেই স্বামীকে নিয়ে থাকতেন।
সেদিনের সেই ১৭ই মে, শেখ হাসিনার আরেকটি নতুন জীবনের শুরু। রেফুজি জীবন শেষে এই নতুন জীবন আন্দোলনের, সংগ্রামের। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সে আন্দোলনে সেই যে এক নতুন হাসিনার জন্ম, আজকের পরিপুর্ণ শেখ হাসিনায় আমি খুজে ফিরি সেই দিনের সেই তরুনী হাসুকে, পরিবার হারিয়ে দিগবিদিকশুন্য, আবেগপ্রবণ শেখ হাসিনাকে। এই খুজে ফেরা তার সংগ্রামমুখর জীবনকে একটা টাইমলাইনে দেখবার জন্য। এক উত্থান পতনময় জীবনের মধ্যে দিয়ে সেদিনের রাষ্টনায়ক, জাতির পিতার কন্যা থেকে রেফুজি কন্যা হয়ে আজকের বিশ্বনেত্রী শেখ হাসিনার এই সংগ্রামমুখর জীবন আমাদের শক্তি দেয়, আমাদের সাহস যোগায়। পরিবারের সকলকে হারিয়ে হতবিহবল সেদিনের তরুণীর এই ঘুরে দাঁড়ানো আমাদেরকে উজ্জীবিত করে।
আর? আর আমাদের ভালোবাসতে শেখায়, যে ভালোবাসায় অকাতরে বোনের প্রাণ বাঁচাতে চট্টগ্রামের লালদিঘীর ময়দানে সহস্র ভাই গুলির বৃষ্টির সম্মুখে বুক পেতে দিতে পারে, তাদের বোন হাসুকে বাঁচাতে। যে ভালোবাসায় গ্রেনেডের সামনে প্রাণ বিলিয়ে দিতে পারে কর্মীরা, তাদের বুবু শেখ হাসিনাকে বাঁচাবার জন্য। পিতা শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘জেল-কারাবাস আমায় দুর্বল করে না, আমায় দুর্বল করে ফেলে আমার জনগনের ভালোবাসা।‘ তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় শক্তি, আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি। আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, আমি তাদেরকে অনেক বেশী ভালোবাসি’। এ ভালোবাসা তারই প্রতিদান, এ ভালোবাসা কখনও শেষ হবার নয়। ১৯৮১ সালের ১৭ই মে, দিনটি তাই ইতিহাসে লেখা থাকুক ঘুরে দাড়াবার দিনের নামে, সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে, বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে একটি সমৃদ্ধ সোনার বাংলায় পরিণত করবার প্রত্যয়ের দিন হিসেবে।

লেখকঃ সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা চিকিৎসা বিজ্ঞান জেলা শাখা।

সুত্রঃ

১) ‘যেভাবে কেটেছিলো দিল্লীতে শেখ হাসিনার নির্বাসিত জীবনের সেই দিনগুলি’, বিবিসি ডট কম (১১এপ্রিল, ২০১৭)
২) ‘যেভাবে পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জেনেছিলেন শেখ হাসিনা’ বিবিসি ডট কম (১৬ আগস্ট, ২০১৭)
৩) ‘The time Delhi gave shelter to Sheikh Hasina’ by Vivek Shukla, DNA INDIA (April 7, 2017)
৪) ‘Tearful PM tells exile story’, BDNEWS24.COM (17 may, 2014)
৫) ‘Hasina revisits Delhi, her home from 1975-81’, BDNEWS24.COM (January 11, 2010)
৬) ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’, ডঃ ওয়াজেদ মিয়া (১৯৯৩)
৭) Bangabandhu’s Daughters by Noman Rashid Chawdhury (son of Mr. Humayun Rashid Chawdhury), The Daily Star (15 August, 2014)

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত