১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ঃ বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ

922

Published on এপ্রিল 18, 2019
  • Details Image

শাহাব উদ্দিন মাহমুদঃ

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল দিনটি ছিল শনিবার। কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের অখ্যাত ভবেরপাড়া গ্রামের বৈদ্যনাথতলায় সাদামাটা পরিবেশে একটি আমবাগানে শপথ নিয়েছিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার। আমবাগানের চারদিকে রাইফেল হাতে কড়া প্রহরায় ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধারা। প্রায় দশ হাজার মানুষের বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে বেলা এগারোটায় আওয়ামী লীগ চীফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলীর স্বাধীনতা সনদ পাঠের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ গঠিত হয়।

এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাঠের মধ্য দিয়ে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তা সাংগঠনিক রূপ নেয়। শপথ অনুষ্ঠানে দেশী-বিদেশী একশ সাতাশ জন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নবগঠিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী, খন্দকার মোস্তাক আহমদ পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী, মনসুর আলী অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রী, এএইচএম কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, যোগাযোগ ও ত্রাণমন্ত্রী নিযুক্ত হন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন অধ্যাপক এম ইউসুফ আলী। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম রচিত, অধ্যাপক ইউসুফ আলী পঠিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের মূল সাংবিধানিক ভিত্তি।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র আইনগত বৈধতা প্রদান করে স্বাধীনতা সংগ্রামের। বাংলাদেশের সংবিধানেও সংযোজিত রয়েছে এই ঘোষণাপত্র। এই দিন কুড়িগ্রাম মহকুমার এসডিও মামুনুর রশীদ, শামসুল হক চৌধুরী, সুবেদার বোরহান উদ্দিন, ম্যাজিস্ট্রেট জিয়াউদ্দিন আহমেদ, প্রফেসর হায়দার আলী, আখতারুজ্জামান মণ্ডল, তাছাদ্দুক হোসেন প্রমুখের নেতৃত্বে কুড়িগ্রাম ন্যাশনাল ব্যাংক ও ট্রেজারিতে রক্ষিত টাকা পয়সা ও সোনাদানা তালা ভেঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় নাগেশ্বরী থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের হেডকোয়ার্টার ভূরুঙ্গামারীতে স্থানান্তর করা হয়। রাঙ্গামাটির মধ্যস্থল বুড়িঘাটে পাকবাহিনীর ২০ জন সৈন্য লঞ্চযোগে রেকি করতে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহের কাছাকাছি হলে গুলি ছুড়তে শুরু করে। ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা আক্রমণ শুরু করলে পাকবাহিনীর অধিকাংশ সৈন্যসহ লঞ্চটি ধ্বংস হয়। শাহবাজপুরে তিতাস ব্রিজ এলাকায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর পাকবাহিনীর একটি ব্যাটালিয়ন আর্টিলারি গানবোট সহকারে আক্রমণ চালায়। সারারাত স্থায়ী যুদ্ধে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ৪টি জঙ্গিবিমান ময়মনসিংহ শহর ও আশপাশে অন্যান্য এলাকায় আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে বহু নিরীহ মানুষ নিহত হয় এবং অনেক জায়গা পুড়ে যায়। নওয়াবগঞ্জের গোদাবাড়িতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ও নওয়াবগঞ্জ শহরের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী জঙ্গী বিমানের সাহায্যে রকেট ও মেশিনগানের হামলা চালায়। ময়মনসিংহের কালিহাতীতে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকসেনাদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়। গোয়ালন্দঘাট পার হয়ে পাকসেনারা রাজবাড়ি পৌঁছায় এবং ব্যাপক গুলিবর্ষণ করে। এতে আনসার কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা ফকির উদ্দিন শহীদ হন। তিনিই রাজবাড়ীর প্রথম শহীদ। যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে পাকসেনারা পুনরায় কুষ্টিয়া দখল করে নেয়। প্রাথমিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা স্টুয়ার্ড মুজিবের নেতৃত্বে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য ভারতের আগরতলার উদ্দেশে মাদারীপুর ত্যাগ করে। ফেনীর গঙ্গাসাগর যুদ্ধে পাকবাহিনীর সার্বিক আক্রমণের মুখে মুক্তিবাহিনী পশ্চাদপসরণ করে। বরিশালের ওপর পাক স্যাবর জেট নির্বিবাদে গোলাবর্ষণ করে। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে একদল সৈন্য বড়দরগা সানেরহাট রাস্তা ধরে গাইবান্ধা দখলের উদ্দেশে ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অগ্রসর হয়। মাদারগঞ্জ ব্রিজের কাছে পৌঁছলে রাস্তা কেটে দিয়ে সুবেদার আফতাবের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যুহ থেকে তাদের ওপর প্রচ- আক্রমণ করা হয়। সকাল থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত সংঘটিত এ যুদ্ধে ২ জন পাকসৈন্য নিহত ও ৫ জন আহত হয়। পাকবাহিনী পশ্চাদপসারণ করার সময় শাখারী পট্টিসহ সমস্ত মাদারগঞ্জ বাজার জ্বালিয়ে দেয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশনায় এই দিন সকালে দমদম এয়ারপোর্টে গোপনে সজ্জিত হয়েছিল ভারতীয় যুদ্ধবিমান বহর। মেহেরপুর সীমান্তে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থান করছিল ভারতের সামরিক বাহিনী। পূর্ব পাকিস্তানে ইউএসএআইডির কর্মরত ডাক্তার জন ই রোহড একাত্তরের এই দিনে সিনেটর স্যাক্সবিকে যে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন তা কাঁপিয়ে দিয়েছিল সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রকে। সেই চিঠিটি সিনেটে উপস্থাপিত হয় ১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল। চিঠিটিতে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ সাধারণ জনগণের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক চালানো নির্বিচারে গণহত্যার চিত্রটি অত্যন্ত সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এই দিনে দৈনিক বাংলাদেশ পত্রিকায় ‘বাংলা বাহিনী দিনাজপুর রণাঙ্গনে বড় রকমের সাফল্য অর্জন করেছেন’ শিরোনামে রণাঙ্গনের খবর প্রকাশ করে। এ ছাড়া ঢাকার আশপাশে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পাক বাহিনীর সংঘর্ষ চলছে। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে পাক সৈন্যের আক্রমণ মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ করেছে। উজিড়নগর এখন বাংলা বাহিনীর দখলে রয়েছে। পাক বিমান বাহিনী ময়মনসিংহ, ফেনী, আশুগঞ্জ, সীতাকুণ্ডে প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ করে। সর্বশেষ খবরে প্রকাশ, মুক্তিবাহিনী চুয়াডাঙ্গায় পাক বাহিনীর হামলা ব্যর্থ করে দিয়েছে। ময়মনসিংহ-কুমিল্লার ৯০০ কিলোমিটার পথে তুমুল যুদ্ধ চলেছে। নিউইয়র্ক টাইমস শিেেরানাম করেছে ‘আটকে পড়া বাঙালী কর্মকর্তার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা’ একজন প্রত্যক্ষ্যদর্শী বাঙালী সেনা কর্মকর্তার বর্ণনায় জানা যায় পাক সেনা কর্মকর্তা নির্দেশ দিচ্ছেন ‘তোমরা সবাই এখনই শহরে যাও এবং সকালের মধ্যে আমি পুরো কুমিল্লা লাশে ঢাকা পড়া দেখতে চাই। যদি কোন কর্মকর্তা তা করতে ইতস্তত বোধ করে, তাহলে সে আমার কাছে কোন ধরনের অনুকম্পা পাবে না।’ দা ইভনিং স্টার ‘পূর্ব পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞ’ শিরোনামে সম্পাদকীয় নিবন্ধে লিখেছে- সব সূত্র যাচাই করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে যে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্তরে এখন যা চলছে তাকে হত্যাযজ্ঞ হিসেবেই অভিহিত করতে হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

প্রকাশঃ দৈনিক জনকণ্ঠ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত