অসাম্প্রদায়িক বঙ্গবন্ধু, মানবিক বঙ্গবন্ধু

1568

Published on আগস্ট 28, 2019
  • Details Image

ড. এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমানঃ

১৫ই আগস্ট জাতির শোক দিবস, জাতীয় শোক দিবস। ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। এমনি এমনি বঙ্গবন্ধু মৃত্যুবরণ করেননি। এ দেশের কিছু কুলাঙ্গার তৎকালীন সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সেনা বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে খুন করে। তাই কোনো গণমাধ্যমে, কোনো ব্যক্তির লেখায়, কারো বক্তব্যে যদি দেখি বা শুনি ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী পালনের কথা বলা হচ্ছে বা লেখা হচ্ছে, তখন ক্ষুব্ধ হই। মেরে ফেলা আর মৃত্যুবরণ করা এক বিষয় নয়। যে মানুষটি মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে ৩০৫৩ দিন কারাভোগ করেন, ব্যক্তিগত কোনো অপরাধে নয়। বারবার তিনি কারাগারে গেছেন মানুষের কথা বলতে গিয়ে, দেশের কথা বলতে গিয়ে, জাতির কথা বলতে গিয়ে। একটা জাতির মুক্তির জন্য, জাতিকে একটা স্বাধীন ভূখণ্ড উপহার দেওয়ার জন্য, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য খুন করা হলো পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্টে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত, তা আমরা এরই মধ্যে জেনে গেছি। কেন বঙ্গবন্ধুকে খুন করা হলো? অনেকে এই ঘটনাকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে থাকেন। আমি তা বলতে চাই না। আমি বলি, এটা ছিল দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। সদ্যঃস্বাধীন দেশকে স্বাধীনতার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধূলিসাৎ করার ষড়যন্ত্র। কেননা রাজনীতিকে তো রাজনীতি দিয়েই মোকাবেলা করতে হয়। কিন্তু ঘাতকদের কোনো আদর্শ থাকতে পারে না। তাই সারা জীবন আদর্শের রাজনীতি করা বঙ্গবন্ধুকে কোনো আদর্শ দিয়ে মোকাবেলা করতে তারা ভয় পেত। বেছে নিয়েছিল অন্ধকার পথ। কাপুরুষের মতো ঘাতকরা মানবতাবিরোধী এ অপরাধ করেছে। তারা ভেবেছিল, তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, তাঁর রাজনীতির দর্শন ধ্বংস করা যাবে। কিন্তু তা হয়নি। কারণ, ‘যখন ঝিলে পদ্ম ফোটে,/সন্ধ্যা নামে রাখাল ছোটে/গৃহের পানে।/তখন বাঁশির সুরে-সুরে/তাকাই ফিরে অন্তঃপুরে/চোখের টানে,/দেখি হিজল তমাল গাছে/তোমার একটি ছবি আছে।’ (‘কোথায় তুমি নেই’, নির্মলেন্দু গুণ) বঙ্গবন্ধু সর্বত্র, সারা দেশের প্রত্যেক মানুষের বুকে খচিত এক নাম।

বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের রাজনীতির সাধনার মূলে অন্যতম আদর্শ ছিল অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবাদ। এই দুটি আদর্শে পরিচালিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধও। ব্যক্তিমানুষ হিসেবে তিনি ইসলাম ধর্মের অনুসারী হলেও সব ধর্মের মানুষের প্রতি ছিল সমান ভালোবাসা। সেখানে বিশ্ব মানবতাবোধ তাঁকে তাড়িত করেছে। বঙ্গবন্ধুর চুয়াল্লিশতম শাহাদাতবার্ষিকী চলে গেল গত ১৫ই আগস্ট। এ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবতাবাদী আদর্শকে স্মরণ করতে চাই। বর্তমান বাংলাদেশেও অসাম্প্রদায়িক চেতনা তথা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি লালনের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, তার মূলে আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রাম, তার মূলে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। দেশের হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। শেষ পর্যন্ত নিজের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক বাঙালি, মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন তিনি।

সদ্যঃস্বাধীন একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সম্বল বলতে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জনগণ আর আত্মবিশ্বাস। অর্থনীতি, অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না। ১৯৭৩ সালে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়েছিলেন আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে। সারা বিশ্বের কাছে তখন তিনি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক তিনি। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ছুটে এসেছিলেন একই সম্মেলনে অংশ নেওয়া কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। এ সম্মেলনে বৈঠক হয় লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও সৌদি বাদশাহ ফয়সালের সঙ্গে। তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে শর্ত দেন, বাংলাদেশকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ ঘোষণা করলে তাঁরা স্বীকৃতিসহ সব ধরনের সহযোগিতা দেবেন। গাদ্দাফি বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চান, বাংলাদেশ তাঁদের কাছে কী চায়? বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা চাই লিবিয়ার স্বীকৃতি। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতি লিবিয়ার স্বীকৃতি।’ গাদ্দাফি জানান, এর জন্য বাংলাদেশের নাম বদলে ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ করতে হবে। বঙ্গবন্ধু পাল্টা জবাব দেন, ‘এটা সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশ সবার দেশ। মুসলমান, অমুসলমান—সবারই দেশ।’ বঙ্গবন্ধু সব ধর্মের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং নিজ দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা রক্ষায় কতটা দৃঢ়চেতা ছিলেন, তা বোঝা যায় সৌদি বাদশাহ ফয়সালের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনে। বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত সত্তাকে জানতে তার অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো—

বাদশাহ ফয়সাল : আপনারা কিংডম অব সৌদি অ্যারাবিয়ার কাছ থেকে কী চাইছেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব : বাংলাদেশের পরহেজগার মুসলমানরা পবিত্র কাবা শরিফে নামাজ আদায়ের অধিকার চাইছে। এক্সেলেন্সি, আপনিই বলুন সেখানে তো কোনো শর্ত থাকতে পারে না? আপনি হচ্ছেন পবিত্র কাবা শরিফের হেফাজতকারী। এখানে দুনিয়ার সমস্ত মুসলমানের নামাজ আদায়ের হক আছে।...আমরা আপনার কাছে ভ্রাতৃসুলভ সমান ব্যবহার প্রত্যাশা করছি।

ফয়সাল : এসব তো রাজনৈতিক কথাবার্তা হলো না। এক্সেলেন্সি, বলুন আপনারা কিংডম অব সৌদি অ্যারাবিয়ার কাছ থেকে কী চাইছেন আসলে?

শেখ মুজিব : এক্সেলেন্সি, আপনি জানেন, ইন্দোনেশিয়ার পর বাংলাদেশ হচ্ছে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ। তাই আমি জানতে চাইছি, কেন সৌদি আরব আজ পর্যন্ত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না?

ফয়সাল : আমি করুণাময় আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে জবাবদিহি করি না। তবু আপনি একজন মুসলমান তাই বলছি, সৌদি আরবের স্বীকৃতি পেতে হলে বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ করতে হবে।

শেখ মুজিব : বাংলাদেশের জন্য এটা প্রযোজ্য হতে পারে না। বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম জনসংখ্যার দেশ হলেও এখানে এক কোটির ওপর অমুসলিম রয়েছে। সবাই একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। নির্যাতিত হয়েছে। তা ছাড়া এক্সেলেন্সি, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, পরম করুণাময় আল্লাহ তো শুধু ‘আল মুসলিমিন’ না, তিনি রাব্বুল আলামিন। সকলের স্রষ্টা। ক্ষমা করবেন, আপনাদের দেশের নাম তো ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব সৌদি অ্যারাবিয়া’ নয়। বরং মরহুম বাদশাহ ইবনে সৌদের সম্মানে ‘কিংডম অব সৌদি অ্যারাবিয়া’। কই, আমরা কেউ তো এ নামে আপত্তি করিনি। (সূত্র : বঙ্গবন্ধুর নীতিনৈতিকতা, হাসান মোরশেদ)

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে, যারা সাম্প্রদায়িক তারা হীন, নীচ, তাদের অন্তর ছোট। যে মানুষকে ভালোবাসে সে কোনো দিন সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। আপনারা যারা এখানে মুসলমান আছেন তারা জানেন যে, খোদা যিনি আছেন তিনি রাব্বুল আলামিন। রাব্বুল মুসলেমিন নন। হিন্দু হোক, খ্রিস্টান হোক, মুসলমান হোক, বৌদ্ধ হোক সমস্ত মানুষ তাঁর কাছে সমান। সেই জন্যই এক মুখে সোশ্যালিজম ও প্রগতির কথা এবং আরেক মুখে সাম্প্রদায়িকতা পাশাপাশি চলতে পারে না। একটা হচ্ছে পশ্চিম। যারা এই বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা করতে চায়, তাদের সম্পর্কে সাবধান হয়ে যাও। আওয়ামী লীগের কর্মীরা, তোমরা কোনো দিন সাম্প্রদায়িকতাকে পছন্দ করো নাই। তোমরা জীবনভর তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছ। তোমাদের জীবন থাকতে যেন বাংলার মাটিতে আর কেউ সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন না করতে পারে।’

পৃথিবীতে সাম্প্রদায়িকতা এখন বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে একসঙ্গে বসবাস করতে গেলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, তাঁর আদর্শ, তাঁর দর্শন চর্চা করতে পারলে তাঁর স্বপ্নের সত্যিকারের সোনার বাংলা গড়তে বেশি সময় লাগবে না। আর তাহলে সারা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হবে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সুদৃঢ় মনোবলের কারণে আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। নতুন প্রজন্মসহ আমাদের সবার কর্মকাণ্ড তাঁর দর্শন ও জীবনাদর্শ অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া উচিত। বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ই আগস্টের সব শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: অধ্যাপক ও উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত