আমার উপর ভরসা রাখুনঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

7071

Published on জানুয়ারি 7, 2020
  • Details Image

জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মানুষের মুখে হাসি ফোটানো মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, আমার উপর ভরসা রাখুন। আমি আপনাদেরই একজন হয়ে থাকতে চাই।

টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের একবছর পূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার (৭ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একথা বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা আজীবন সংগ্রাম করেছেন এসব মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, তাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। তার কন্যা হিসেবে আমার জীবনেরও একমাত্র লক্ষ্য মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আমার উপর ভরসা রাখুন। আমি আপনাদেরই একজন হয়ে থাকতে চাই।

পুরো বক্তব্যটি পড়ুনঃ জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ

পুরো বক্তব্যটি দেখুনঃ জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ

শেখ হাসিনা বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের একবছর পূর্ণ হলো। বিগত একবছর আমরা চেষ্টা করেছি আপনাদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে। আমরা সবক্ষেত্রে শতভাগ সফল হয়েছি তা দাবি করবো না। কিন্তু এটুকু জোর দিয়ে বলতে পারি, আমাদের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না।

‘অতীতের ভুল-ভ্রান্তি এবং অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। আমাদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে। সবার সহযোগিতায় আমরা সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবো, ইনশাআল্লাহ।’

দেশের মানুষের ওপর নিজের আস্থার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সাধারণ মানুষকে ঘিরেই আমার সব কার্যক্রম। আপনাদের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ অসাধারণ পরিশ্রমী এবং উদ্ভাবন-ক্ষমতাসম্পন্ন।

‘যে কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে সক্ষম। অল্পতেই সন্তুষ্ট এ দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।’

দলমত নির্বিশেষে সবাইকে দেশ গড়ার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আসুন, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে দলমত নির্বিশেষে সবাই মিলে তার স্বপ্নের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার জন্য নতুন করে শপথ নেই।

তিনি বলেন, বাঙালি জাতি বীরের জাতি। ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা এদেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি। এমন জাতি পৃথিবীতে কোনোদিন পিছিয়ে থাকতে পারে না। আমরাও আর পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে।

'মুজিববর্ষ নতুন জীবনিশক্ত সঞ্চার করবে'

জাতির জীবনে নতুন জীবনীশক্তি সঞ্চারিত করতে ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই উদযাপন শুধু আনুষ্ঠানিকতা-সর্বস্ব নয়, এই উদযাপনের লক্ষ্য জাতির জীবনে নতুন জীবনীশক্তি সঞ্চারিত করা; স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে জাতিকে নতুন মন্ত্রে দীক্ষিত করে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়া। ’

‘২০২০ খ্রিস্টাব্দে আমাদের জাতীয় জীবনে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছর উদযাপিত হতে যাচ্ছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। আগামী ১৭ই মার্চ বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শুভ সূচনা হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যেই ২০২০-২১ সালকে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছি। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের অনুষ্ঠানমালা যুগপৎভাবে চলতে থাকবে।’

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ আগস্টের শহীদ, জাতীয় চার নেতাসহ জাতীয় জীবনে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে শহীদদের কথা স্মরণ করেন এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ ‘মুজিব বর্ষ’ ঘোষণা করেছে সরকার। আগামী ১৭ই মার্চ বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালা শুরু হবে।

আগামী ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে রাজধানীর পুরাতন বিমানবন্দরে এক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে মুজিব বর্ষের কাউন্টডাউন শুরু হবে।

'শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে স্বাগত জানানো হবে'

শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে স্বাগত জানানো হবে জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, যে কোনো শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে, অযৌক্তিক দাবিতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে আমরা বরদাশত করবো না।

‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। আমরা সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আইনের শাসনে বিশ্বাসী। আমরা বিশ্বাস করি জনগণের রায়ই হচ্ছে ক্ষমতার পালাবদলের একমাত্র উপায়।’

শেখ হাসিনা বলেন, দেশবাসী আপনারা অতীতে আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামাতের অগ্নি-সন্ত্রাস ও মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা দেখেছেন। বাংলাদেশের মাটিতে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি আর হতে দেওয়া হবে না।

জাতীয় সংসদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংসদকে কার্যকর করতে সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি। সরকারি, বিরোধীদলের সংসদ সদস্যগণের অংশগ্রহণ সংসদকে প্রাণবন্ত করেছে।

জনগণকে সব সময়ই সব ধরনের গুজব বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

'আমরা মুখরোচক প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী নই'

জনগণকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আপনাদের জন্য কী করতে চেয়েছিলাম আর কী করতে পেরেছি এ বিষয়ে আমরা সব সময়ই সচেতন। আপনারাও নিশ্চয়ই মূল্যায়ন করবেন। তবে আমরা মুখরোচক প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী নই। আমরা তা-ই বলি, যা আমাদের বাস্তবায়নের সামর্থ্য রয়েছে।

টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আমরা রূপকল্প ২০২১ ঘোষণা করেছিলাম। যার অন্তর্নিহিত মূল লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করা। মাথাপিছু আয় ১২শ মার্কিন ডলার অতিক্রম করায় বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার, ২০১৯ সালে তা ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১.৫ শতাংশ। বর্তমানে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২০.৫ শতাংশে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের হিসাব মতে ২০১০ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ছিল ৭৩.৫ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা ১০.৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশের প্রমাণ মেলে তার বার্ষিক আর্থিক পরিকল্পনায়। ২০০৫-৬ অর্থবছরে বিএনপি সরকারের শেষ বছরে বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেটের আকার সাড়ে আট গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকায়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকায়। বাজেটের নব্বই ভাগই এখন বাস্তবায়ন হয় নিজস্ব অর্থায়নে।

প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গত অর্থবছরে আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮.১৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ শতাংশের নিচে। বছরের শেষ দিকে আমদানি-নির্ভর পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি ব্যতীত অন্য নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম স্বাভাবিক ছিল।

'বাংলাদেশের অর্থনীতি মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত'

ছোট-খাট বাধা বাংলাদেশের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। ছোটখাটো অভিঘাত এই অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের একটি এখন বাংলাদেশ। আইএমএফ-এর হিসাব অনুযায়ী পিপিপির ভিত্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থান ৩০তম। প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারস-এর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বে ২৩তম স্থান দখল করবে। এইচবিএসসি’র প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে।

‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলছে ২০২০-এ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো থেকে এগিয়ে থাকবে।’

মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানো এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে যাওয়া প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করেছি। পাবনার রূপপুরে ২৪শ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলেছে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাগুলো সম্পৃক্ত করে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে।

‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ নামে শতবর্ষের একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।

'মানুষ উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখে'

বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নচিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষ উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দশ বছর আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশের মধ্যে বিরাট ব্যবধান। মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেছে। ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। এদেশের মানুষ ভালো-কিছুর স্বপ্ন দেখা ভুলেই গিয়েছিল।

‘মানুষ আজ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে উন্নত জীবনের। স্বপ্ন দেখে সুন্দরভাবে বাঁচার। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিন ভাগের দুই-ভাগেরও বেশি কাজ শেষ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রমত্তা পদ্মানদীর উপর সেতু নির্মিত হবে আর সেই সেতু দিয়ে গাড়ি বা ট্রেনে সরাসরি পারাপার করতে পারবে- এটা ছিল মানুষের স্বপ্নেরও অতীত। আমরা সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চলেছি।

তিনি বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। তিন ভাগের দুই-ভাগেরও বেশি কাজ শেষ হয়েছে। পদ্মাসেতুর প্রায় অর্ধেকাংশ এখন দৃশ্যমান।

রাজধানীর যানজট নিরসনে সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। পাতালরেল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে। ’

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে দেশের প্রথম টানেলের চলমান নির্মাণ কাজের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-চন্দ্রা মহাসড়ক চার-লেনে উন্নীত করার পর চন্দ্রা-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব স্টেশন, বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম স্টেশন-রংপুর এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত করার চলমান কাজের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

রেলের উন্নয়নের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, নতুন রেলপথ নির্মাণ, নতুন কোচ ও ইঞ্জিন সংযুক্তি, ই-টিকেটিং এবং নতুন নতুন ট্রেন চালুর ফলে রেলপথ যোগাযোগে নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে। ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত ৪০১ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। ১২২টি নতুন ট্রেন চালু করা হয়েছে। পদ্মাসেতু উদ্বোধনের দিন থেকেই সেতুর উপর দিয়ে রেল চলাচল শুরু হবে বল আশা করছি। দেশের সব জেলাকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনা হচ্ছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ড্রিমলাইনার যুক্ত করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিমান বহরে ৬টি নতুন ড্রিমলাইনার যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিজস্ব উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।’

দেশের প্রতিটি গ্রামে শহরের সুবিধা পৌঁছে দিতে সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

ইতোমধ্যে ৯৫ শতাংশ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ এবং ৯৭ ভাগ মানুষ উন্নত স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় এসেছে বলে জানান তিনি।

টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহ নিশ্চিত করতে রামপাল, মাতারবাড়ি, পায়রা ও মহেশখালীতে মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে চলমান কাজের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১১ বছরে ২০ হাজার ১০২ জন নতুন চিকিৎসক এবং ২১ হাজার ৬৯৭ জন নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে একটি করে মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের কাজ চলছে।

প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত প্রতি বছর ২ কোটি ৩ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি, উপ-বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৬৮৫টি মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ জাতীয়করণ এবং ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৬৬১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশ অতিক্রম করেছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ১৫ কোটিরও বেশি সিম ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৯ কোটি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

চলতি মেয়াদে সরকারের দেড় কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা পুনরুল্লেখ করেন তিনি।

'উন্নত দেশকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ'

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস, লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ, শিক্ষার হার ও গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ তার দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদেরই শুধু নয়, অনেক উন্নত দেশকেও ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

‘জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চহার অর্জনের পাশাপাশি নানা সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে।’

টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ সাল থেকে আমরা একটানা সরকার পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছি। আমরা একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সরকার পরিচালনা করছি। আর সে লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং তাদের জীবনমানের উন্নয়নসহ সবার মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

শেখ হাসিনা বলেন, ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা ২০০৯ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করি। বিএনপি-জামাত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের আর্থিক ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে এবং সেই সময়কার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করে আমরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হই।

‘তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে একটি সুপরিচিত নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।’

'দুর্নীতিবাজদের ছাড় দেওয়া হবে না'

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি আহ্বান থাকবে, যে-ই অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িত থাকুক, তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসুন। সাধারণ মানুষের ‘হক’ যাতে কেউ কেড়ে নিতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি আবারও সবাইকে সতর্ক করে দিতে চাই- দুর্নীতিবাজ যে-ই হোক, যত শক্তিশালীই হোক না কেন- তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আপনাদের স্মরণ আছে, গতবছর সরকার গঠনের পর জাতির উদ্দেশে ভাষণে আমি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের শোধরানোর আহ্বান জানিয়েছিলাম। আমি সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করি। মানুষের কল্যাণের জন্য আমি যে কোনো পদক্ষেপ করতে দ্বিধা করবো না।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছি। তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি নির্মূল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি বন্ধে জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি। মানুষ সচেতন হলে, দুর্নীতি আপনা-আপনি কমে যাবে।

'আলোচনার মাধ্যমে সমাধান প্রক্রিয়া আমাদের কৌশল'

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আলোচনার মাধ্যমে আমরা দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধান করতে চাই। এটি আমাদের দুর্বলতা নয়, কৌশল। এ কারণেই মিয়ানমারের দিক থেকে নানা উসকানি সত্ত্বেও আমরা সে ফাঁদে পা দেইনি। আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানের পথ থেকে সরে যাইনি।

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’-এ (আইসিজে) থেকে একটা সমাধান সূত্র পাওয়া যাবে আশা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে মামলা হয়েছে। আমরা আশা করছি, এই আদালত থেকে আমরা একটি স্থায়ী সমাধান সূত্র খুঁজে পাবো।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত