ফজিলাতুন্নেছা মুজিবঃ শুদ্ধতম বাঙালি আদর্শের প্রতীক

2009

Published on জানুয়ারি 19, 2021
  • Details Image

বেবী মওদুদঃ

আমরা কবির কন্ঠে শুনেছিঃ ‘রাজা করিতেছে রাজ্য শাসন, রাজারে শাসিছে রানী, রানীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।’ আগেকার দিনে রাজা-বাদশাহদের আমলে এমন ঘটোনার কথা আমরা শুনে থাকি। রাজ্য নিয়ে রাজনীতি, ক্ষমতা নিয়েই দ্বন্দ্ব, দম্ভ। জনগণের ভাগ্য নিয়ে কেউ কেউ থাকে নির্লিপ্ত, ভাঁওতাবাজি করে ঠকায়, নির্বিচারে অত্যাচার ও আনাচারে নির্যাতন চালিয়ে করে থাকে শোষণ। ফলে ক্ষমতাবানরাই হয় প্রভাবশালী ও বিত্তবান। জনগণের ভাগ্যে জোটে বঞ্চনা ও গ্লানি। কিন্তু কোনো কোনো রাজার দয়াবতী রানীর হৃদয়ের মহানুভবতা ও দূরদর্শিতার কাছে শাসক রাজাও পরাস্ত হয় এবং রানীর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করায় রাজ্যের গ্লানিও দূর হয়ে থাকে।

আজকের বিশ্বরাজনীতি গণতন্ত্রকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। নির্বাচনই চূড়ান্ত করে দেয় ক্ষমতাধর কে হবে। আর এই ক্ষমতায় যাবার জন্য মানুষের দরদী নেতা হবার এত সংগ্রাম। কিন্তু সত্যকথাটা হল, প্রকৃত দরদী হিসেবে জনগণের নেতা হবার ভাগ্য সবার হয় না। এ বড় কঠিন পথ, কণ্টকাকীর্ণ পথ। এজন্য প্রয়োজন দেশপ্রেমিক, আদর্শবাদী, আত্মত্যাগী, সাহস ও দূরদর্শী মেধার অধিকারী এক মানবিক হৃদয়সম্পন্ন নেতা – তিনিই কেবল পারেন জনগণের নেতা হতে। আমাদের পরম সৌভাগ্য বাঙালি জাতির কোলে জন্ম নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি জাতির জনক হয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন যুগ যুগ ধরে। ‘যতকাল রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’ – কবির কন্ঠ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ উচ্চারণই তা প্রমাণ করেছে, স্বীকৃতি দিয়েছে।

আমাদের এখানে মনে রাখতে হবে, একটি জাতির জনক হয়ে ওঠা কিন্তু কম কথা নয়। অনেক বড় কথা। এর পেছনে রয়েছে নিজের ব্যক্তিজীবন, পরিবার-পরিজন (বিশেষ করে মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান), আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবসহ পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সহকর্মীর অবদান।

বঙ্গবন্ধু শেক্ষ মুজিব জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ব্রিটিশ শাসনামলে টুঙ্গীপাড়া নামে এক অজপাড়াগাঁয়। কৃষিপ্রধান এলাকা, নিম্নাঞ্চল হওয়ায় বন্যায় প্লাবিত হয়ে থাকে প্রতিবছর। দারিদ্র্য ও অনুন্নত জীবন-যাপন তখন বাংলার গ্রামগুলোকে গ্রাস করে রেখেছিল। তারপরও শিক্ষার্জনে বাঙালি আগ্রহী হয়ে ওঠে। সংস্কৃতিচর্চায়ও গভীর আত্মনিবেদিত ছিল। ব্রিটিশ অধীন বাংলাদেশ ছিল ভারতবর্ষের একটি বড় অংশ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশের সকল শ্রেণীর মানুষ ছিল সংগ্রামরত। তাঁদের দেশপ্রেম, আদর্শবাদ, সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগ ছিল অভূতপূর্ব।

গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিব। চার বোন ও দুভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। গ্রামের প্রকৃতির আলো-হাওয়ায় তিনি বড় হয়ে ওঠেন, পারিবারিকভাবেও তাঁর প্রতি ছিল সকলের একটি সযত্ন দৃষ্টি। মা-বাবার স্নেহ, ভাই-বোনের ভালোবাসায় সমৃদ্ধ তো বটেই, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়াপ্রতিবেশী সকলের কাছেই তাঁর একটি ভিন্ন অবস্থান ছিল, যা জীবনের শেষদিনটি পর্যন্ত বজায় ছিল। বলা চলে একটা নিবিড় ঘনসম্পর্ক জড়িয়ে ছিল। বাড়ির সামনের মসজিদের ইমাম আবদুল হালিম সাহেব জুলাই ১৯৭৫ সালে তাঁর সঙ্গে ঢাকায় দেখা করতে এলে তিনি সাদরে অভ্যর্থনা করে পাশে বসান এবং তাঁর কাছে বিনীত কন্ঠে সেদিন বলেছিলেন, ‘আমার জানাজার নামাজ কিন্তু আপনি পড়াবেন।’ শেষপর্যন্ত হালিম সাহেবই পড়াতে সমর্থ হন। একথা তিনি নিজেই আমার কাছে অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বলেছিলেন।

আমরা এখন আলোচনা করব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা রেনুর কথা। একজন জাতির জনক হয়ে ওঠার পেছনে এই মহীয়সী নারীর অবদান আমাদের অবশ্যই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে। কৃতজ্ঞতার সাথে মূল্যায়ন করতে হবে। ফজিলাতুন্নেছা ছিলেন শেখ মুজিবের চাচাত বোন। তারা দু বোন ছিলেন, কোনো ভাই ছিল না। শৈশবে পিতৃমাতৃহীন হওয়ায় তাদের দাদা শেখ কাশেম দু বোনের নামে জমিজমা ও বসতবাটি লিখে বিয়ে দিয়ে দেন। ফজিলাতুন্নেছার বয়স তখন মাত্র তিন বছর, শেখ মুজিবের তেরো বছর। পাঁচ বছর বয়সে তাঁর মা মারা গেলে মুজিবের স্নেহময়ী মা সাহারা খাতুন ছেলের বউকে কোলে তুলে নিজের কাছে রেখেই ছেলেমেয়েদের সঙ্গে লালন-পালন করেন। সেই সময় একান্নবর্তী পরিবারের প্রচলন ছিল। এছাড়া বাড়িতে আশ্রিত হিসেবে নিকট-আত্মীয়স্বজনদের অবস্থান ছিল। তাদের জন্য ধর্মশিক্ষা ও স্কুলের শিক্ষার জন্য বাড়িতে শিক্ষক থাকতেন, আবার মেয়েদের সেলাই, রান্নাসহ গৃহস্থালির কাজকর্মও শিক্ষাও হত বাড়ির দাদি-নানি, মা-শাশুড়ির কাছে।

ফজিলাতুন্নেছার সৌভাগ্য হয়েছিল যে, শেখ মুজিবের মা ও বাবার অপত্য স্নেহের আশ্রয়ে তিনি বড় হয়ে ওঠেন। শিশুবয়স থেকে স্বামীর স্বভাব, মেজাজ, আদর্শ ও ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন – তাই পেছনে দাঁড়িয়ে তাঁকে সহযোগিতা করতে সক্ষম হন অত্যন্ত শক্তহাতে, হৃদয়ের মাধুর্য দিয়ে ও এক অঙ্গীকারাবদ্ধ আত্মত্যাগের মহিমায়। ফজিলাতুন্নেছাকে একটু একটু করে গড়ে তোলেন শেখ মুজিবের মা সাহারা খাতুন। মাতৃপিতৃহারা এই শিশুটির হৃদয়জুড়ে ছিল এক অপরিসীম দুঃক্ষ ও বেদনার ভার। বিরাট এক সংসারে অনেকের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। তখন থেকেই তাঁর মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতার শিক্ষা গড়ে ওঠে। সেইসঙ্গে আত্মত্যাগের শুদ্ধতা তাঁকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। লেখাপড়ার প্রতি ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। স্কুলে পড়তে যেতে পারেননি। ঘরে বসেই যে শিক্ষা অর্জন করেন, সেটাই তাঁর স্বাভাবিকত্ব। তরুণ বয়সে তিনি নিজেই পাড়ার মেয়েদের জন্য একটা স্কুল খোলেন এবং নিজেই সেখানে শিক্ষা দিতেন – এটা আমরা বঙ্গবন্ধুর লেখা একটা চিঠি থেকে পাই। বই পড়তে ভালোবাসতেন তিনি, এটা তাঁর নিঃসঙ্গতার একমাত্র সঙ্গী ছিল।

শেখ মুজিব ১৯৪২ সালে যখন কলকাতায় লেখাপড়া করতে যান, তখন মাত্র বারো বছর বয়স ফজিলাতুন্নেছার। গ্রামের বাড়িতে শাশুড়ির কাছে থাকতেন। স্বামীর লেখাপড়ার জীবন ছাড়াও ছাত্ররাজনীতি, রাজনীতি, দেশসেবার কথা শোনেন। স্বামীর জীবনাদর্শও উপলব্ধি করতে শেখেন ধীরে ধীরে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে মা হলেন, তবে প্রথম পুত্র সন্তানটি জন্মের পরই মারা যায়। এরপর কন্যাসন্তান শেখ হাসিনার জন্ম হলে তিনি যেন সময় কাটানোর সঙ্গী পান। যতদিন বেঁচেছিলেন এই কন্যাসন্তানই তাঁর সকল সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও আলাপ-আলোচনার একমাত্র সাথী ছিলেন।

ফজিলাতুন্নেছা অল্প বয়স থেকেই স্বামীর জীবনাদর্শের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। স্বামীর স্নেহ-ভালোবাসায় ভরপুর এ মহীয়সী সর্বদা স্বামীর প্রতি উদারহস্ত ছিলেন। বিশেষ করে সে-যুগে মুসলমান-ঘরের মেয়েরা গার্হস্থ্য কর্মকাণ্ডে সদা ব্যস্ত থাকতেন, দেশ ও সমাজ নিয়ে চিন্তাভাবনার প্রশ্নই ছিল না। ধর্মীয় অন্ধত্ব, সামাজিক কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতার বেড়াজালে তাঁদের জীবন অতিবাহিত করতে হত। স্বামী বাড়িতে এলে তাঁর কাছেই শুনতেন তাঁর সকল কর্মকাণ্ড। এরপরও তাঁর সতর্ক দৃষ্টি ছিল যে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি যেন লেখাপড়া সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে যান। সে-কারণে প্রতিটি পরীক্ষার সময় তিনি কলকাতায় চলে যেতেন এবং বোনদের বাড়িতে থেকে স্বামীর লেখাপড়া ও সেবাযত্নের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। এমনকি রাজনীতি করতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে তাঁর পিতা-মাতা অর্থ দিলেও ফজিলাতুন্নেছাও আলাদা করে কিছু বরাদ্দ রাখতেন। বলা চলে, নিজের প্রতি সদা-উদাসীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনকে গুছিয়ে দেবার এমন নির্ভরযোগ্য দায়িত্বশীল জীবনসঙ্গী হিসেবে ফজিলাতুন্নেছাই ছিলেন একমাত্র উপযুক্ত। আর তিনিই জীবনের সব রকম আনন্দ-সুখ-বিলাসিতা ও মোহ থেকে ঊর্ধে উঠে নিজেকেও স্বামীর যোগ্য সঙ্গিনী হিসেবে তৈরি করতে সমর্থ হন।

ইংরেজরা ভারতবর্ষ ভাগ করে দিয়ে চলে যাবার পর ঢাকাকেন্দ্রীক বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। যে পাকিস্তানের জন্য তিনি এত আন্দোলন করেছিলেন, সেই পাকিস্তান সরকারই বাংলার মানুষের উপর শোষণের শাসন চালাতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নতুন করে রাজনৈতিক দল গঠন করে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তুললেন। আর তার উপরই নেমে আসে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর জেল-জুলুমের নির্যাতন। বাইরে থাকলে গোয়েন্দাদের তৎপরতা। এক শ্বাসরুদ্ধকর জীবন ছিল তাঁর। তখন বিচিত্র সব ছদ্মবেশে বিভিন্ন ধারায় যাতায়াত করতে হত তাঁকে। গোপন বৈঠক, কর্মীদের সংগঠিত করা, সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধি, নেতাদের বৈঠকে বসানো, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আন্দোলন পরিচালনা করা, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভাষা-আন্দোলন, কৃষক-আন্দোলন, শ্রমিক-আন্দোলন, দাওয়ালদের আন্দোলন, ছাত্র-আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলন – সর্বত্রই শেখ মুজিবের ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি। ভাষা-আন্দোলনের সময় কারাগারে একটানা অনশন করে তিনি মৃত্যুপথযাত্রী হয়ে ওঠেন। গ্রেফতার হয়ে কয়েকবার কারাবরণও করতে হয়েছে তাঁকে। নির্বাচনে বিজয়ী পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে বাংলার মানুষের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন। আবার প্রাদেশিক মন্ত্রীও হয়েছেন দুবার। তারপর পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতি সব শাসকগোষ্ঠীর ছিল শ্যেনদৃষ্টি। কখনও ভারতের দালাল, কখনও দেশদ্রোহী, কখনও ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে তাঁকে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা করা হয়। কারাগারের নির্জন সেলে বসে তিনি হতাশায় নিরাশায়, আবার কখনও নতুন উদ্দীপনায় উজ্জীবিত হয়ে উঠতেন।

এ সবকিছুর পেছনে তাঁর পিতার যেমন কল্যাণ কামনা ছিল তেমনি ফজিলাতুন্নেছারও বিরাট সাহসিকতাপূর্ণ অবদান ছিল। সেই পঞ্চাশের দশকে তিনি তিনটি শিশুসন্তানকে নিয়ে ঢাকা শহরে এসে বাড়ি ভাড়া করে বসবাস করতে থাকেন। স্বামী রাজনীতি করেন তাই বাড়ি ভাড়া পাওয়াও ছিল কঠিন, ছেলেমেদের ভর্তি করাও ছিল কঠিন। তারপরও তিনি সামলেছেন ঘর-সংসার। এমন কঠিন সংগ্রাম ছিল তাঁর। স্বামীর রাজনৈতিক জীবনকে মোকাবেলা করে সন্তানদের আদর্শবাদী হিসেবে মানুষ করে তোলেন। মায়ের মমত্ব তাঁর মধ্যে অপরিসীম ছিল। আবার রাজবন্দি স্বামীর মামলার তদারকি করতে আইনজীবীদের কাছেও ছুটেছেন। নিজের গহনা বিক্রি করে মামলা চালিয়েছেন। জমির ধান বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ করেছেন।

ষাটের দশকে তো তাঁর ছিল বিপুল আত্মত্যাগ। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামি শেখ মুজিবের ফাঁসি হয়ে যাবে, সে সময় তিনি দলকে আন্দোলনের জন্য সংগঠিত করেছেন। ঘরে সভা করতে দিচ্ছেন, অর্থও যোগান দিচ্ছেন। সেসময় বেগম মুজিবকে সামরিক গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসাবাদও করেছিল। বন্দি শেখ মুজিবকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাতে ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পরামর্শ দিতে তিনি কারাগারে সাক্ষাৎও করেছেন। ওই সময়ে একদল বিরোধী নেতার প্রস্তাব ছিল প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের। কিন্তু বেগম মুজিব এ খবর জানতে পেরে ত্বরিত গতিতে তাঁর কাছে পৌঁছে বলেনঃ ‘তুমি যদি ঐ নেতাদের কথায় প্যারোলে যাও তাহলে আমি পল্টোন ময়দানে তোমার বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেব।’ কী পরিমাণ সাহস ও দেশপ্রেম তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল আমরা সহজেই তা অনুমান করতে পারি।

আবার ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু যেদিন ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাষণ দিলেন, সেদিন যাবার আগে বেগম মুজিব তাঁকে একাকি বিশ্রাম করতে দেন। সেদিনও তিনি তাঁকে বলেছিলেন, ‘সারা দেশের মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। তুমি তাদের নিরাশ করবে না। তোমার মনে যা বলে তুমি তাই বলবে।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণার প্রাথমিক পর্বটি সেরে ফেলেন। অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে উচ্চারণ করে – ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালাবাগ কারাগারে। সামরিক আদালতে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। কারাগারে কবরও খুঁড়ে রাখা হয়। আর এদিকে বেগম মুজিব ও তাঁর সন্তানদের আত্মীয়বাড়িতে ঘুরে ঘুরে আশ্রয় নিতে হয় এবং পরে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁদের গ্রেফতার করে ধানমন্ডি ১৮ নং রোডের একটি বাড়িতে বন্দি করে রাখে। এই বন্দিজীবনেও দুঃসহ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তাঁকে।

তারপরও তিনি ধৈর্য হারাননি। একদিকে হাসপাতালে অসুস্থ শয্যাশায়ী শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা, সন্তানদের দেখাশোনা, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জ্যেষ্ঠাকন্যা শেখ হাসিনার প্রথম সন্তান জয়ের জন্মলাভ, সৈন্যদের গঞ্জনা শোনা; অপরদিকে স্বামীর চিন্তায় মগ্ন – একটা অমানুষিক চাপ সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। দীর্ঘ নয়মাসে বন্দি অবস্থায় যে-কোনো মুহূর্তে তাঁর মৃত্যু ছিল অনিবার্য!

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরও তিনি গৃহের অন্তরালে থেকে শেখ মুজিবের সেবাযত্ন করেছেন, পাশাপাশি পারিবারিক কাজকর্মে দায়িত্বশীল ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর রাষ্টীয় জীবনে তাঁকে একবার অথবা দুবার ছাড়া কখনও দেখা যায়নি। ১৯৭২ সালে তিনি নারী পুনর্বাসন বোর্ডের কয়েকজন মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন নিজে উদ্যোগী হয়ে। সমাজকল্যাণমূলক কাজে সাহায্য-সহযোগিতায় তাঁর প্রচুর অবদান রয়েছে, কিন্তু কখনও তিনি প্রচার করতেন না। কখনও ভেঙ্গে পড়তেন না। শান্ত স্বভাবের ছিলেন। বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই আসীম ধৈর্য ও সহনশীলতা দিয়ে যে-কোনো বিপদের মোকাবেলা করতে পারতেন।

আজকের দিনে আমরা ফার্স্ট লেডি দেখি, শাসকদের স্ত্রীদের দেখি, তাদের প্রচার ও ব্যয়বহুল বিলাসিতাও দেখি রাজনৈতিক নেতাদের পরিবারে। সে হিসাবে বেগম মুজিব ছিলেন একেবারে দীনহীন এবং তুলনাবিহীন। আদর্শ বাঙালি পরিবারের স্ত্রী ও মা হিসেবে ছিলেন অনন্যা। আবার একজন দেশপ্রেমিক, আত্মত্যাগী ও জনগণমন অধিনায়ক রাজনৈতিক নেতার স্ত্রী হিসেবে ছিলেন উপযুক্ত সহকর্মী।

একটি জাতির জনক হিসেবে শেখ মুজিবের আবির্ভাব ছিল অবশ্যম্ভাবী, তেমনি শেখ মুজিবের আদর্শ স্ত্রী হিসেবে ফজিলাতুন্নেছাই ছিলেন সবচেয়ে যোগ্য।

কী এক আশ্চর্য হৃদয়ের প্রেম ছিল তাঁদের, কী এক আশ্চর্য অনুভূতিসম্পন্ন জীবন ছিল তাঁদের, কী এক আশ্চর্য মানবিক শুদ্ধতম প্রতীক ছিলেন তাঁরা! জীবনে একত্রে ছিলেন ‘দুজনে দুজনার তরে।’ আবার মরণেও ‘দুজনে এক হয়ে অমরতা’ লাভ করলেন। আমাদের সৌভাগ্য আমরা তাঁদের দুজনকেই পেয়েছিলাম। আমাদের দুর্ভাগ্য তাঁদের দুজনকে রক্ত দিয়ে জীবন দিতে হল বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য।

ইতিহাসের গবেষকরা একদিন নিশ্চয়ই যথাযথভাবে ফজিলাতুন্নেছার মূল্যায়ন করবেন, এ বিশ্বাস আমার আছে।

সূত্রঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবার- বেবী মওদুদ, পৃষ্ঠা নং- ১৬-২২

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত