জন্মদিনে শ্রদ্ধা- মুক্তির মহানায়ক, বাঙালির মুজিব ভাই

1412

Published on মার্চ 16, 2021
  • Details Image

খন্দকার হাবীব আহসানঃ

এই বঙ্গভূমিতে বাঙালির স্বাধীনতার স্বাদ ভোগের স্বপ্ন সুপ্রাচীন এক পৌরাণিক গল্প। উর্বর পলিমাটি খুড়ে স্বপ্নের বীজ বোনা বাঙালি, ফল ভোগের সময় দুর্ভাগ্যবসত বঞ্চিত- প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। বঞ্চিত বাঙালীর এই নিষ্পেষিত জীবন আর দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটাতে চেষ্টা করেছেন অনেকেই, শ্রম, রক্ত,আবেগ দিয়ে কিন্তু নেতৃত্বগণের চুড়ান্ত সফলতা অর্জনের দুর্দান্ত সাহসিকতার অভাবে দাসত্বের মুক্তি মেলেনি যুগ যুগান্তরেও। পরাধীনতার শেকল ছিড়ে ডানা মেলা গাঙচিল হয়ে বাঙালির মুক্ত আকাশ দেখার লালিত স্বপ্নের মুক্তি কোটি প্রাণের আত্মার আত্মীয় মুজিব ভাইয়ের অপরাজেয় সংগ্রামের সফলতা।

নেতৃত্বগুণে স্বপ্ন জয়ের চুড়ান্ত চেষ্টার পথে নির্ভীক বিপ্লবে সদর্পে হেটে যাওয়া প্রথম এবং একমাত্র মানুষটি ছিলেন জাতির মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।বাঙালীর স্বপ্ন বিজয়ের সে পথচলায় কাটা বিছানোর কাজটি যে প্রতিক্রয়াশীল গোষ্ঠী করেছিলো, বাঙালীর স্বাধীনতার মুক্ত বাতাস এখনও তাদের বুকের রক্তক্ষরণ। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসীম সাহস, বিচক্ষণ নেতৃত্বগুণ আর বাঙালীর স্বাধীনতার স্বপ্ন বিজয়ের আবেগ-দেশপ্রেমে আত্মত্যাগের মনোবাসনা দিয়েই সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল শাসনযন্ত্র থেকে একটি শোষিত জনপদের ঘরে শুধু একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের বাসিন্দা হওয়ার গৌরবই এনে দেননি বরং অসাম্প্রদায়িকতা ও প্রগতিশীলতার যে খোলা জানালা উন্মুক্ত করেছিলেন তার পরিধি সুবিশাল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শৈশবে গ্রামীন জীবনের দুরন্তপনা, কৈশোর থেকে যৌবনে ছাত্রজীবনের সংগ্রামমূখর সময়কাল এবং পরবর্তীতে সমগ্র বাঙালি জাতিকে দেশপ্রেমে জাগ্রত করে আপোসহীন মুক্তি সংগ্রামের লড়াই করতে গিয়ে টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে বাঙালির আত্মিক বন্ধনে মুজিব ভাই হিসাবে অবিসংবাদিত নেতায় পরিনত হওয়ার গল্পই বাঙালির মুক্তির ইতিহাস। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শোষণ থেকে সদ্য মুক্ত যুদ্ধবিদ্ধস্ত রাষ্ট্রটির আগামীর ভাগ্য নির্ধারণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে মুজিব ভাই কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছর। ভাগ্যহত বাঙালীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের ভিত বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে তৈরি হয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক,সাংষ্কৃতিক উন্নয়নের যে আকাশচুম্বী অট্টালিকা বেড়ে উঠছিলো তা ধুলিসাৎ হয়ে দুঃস্বপ্নে মিলিয়ে যায় ১৫ ই আগস্টের মর্মান্তিক তান্ডবে।

টুঙ্গিপাড়া থেকে ধানমন্ডির এই সময়গুলোতে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বাংলার মানুষের যে দিলখোলা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো তার প্রমাণ মেলে অনেকের বর্ননা করা ঘটনাবলিতেই। খোকা, শেখ সাহেব, মুজিব ভাই, বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা অনেক নামের মধ্যে বঙ্গবন্ধু নিজেই মুজিব ভাই ডাকটি পছন্দ করতেন। প্রয়াত সাংবাদিক ও কলামিস্ট এ বি এম মূসা’র লেখা 'মুজিব ভাই' নামে একটি বই রয়েছে। বইটিতে মুজিব ভাই সহজাত স্বভাবে পুরোপুরি বাঙালির আদর্শ চরিত্র হয়ে দেশের মানুষ বা অনান্যদের যেভাবে মধুর সম্পর্কের বর্নানা করা হয়েছে তাতে বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু নেতা হওয়ার বাইরেও আপামর বাঙালির ভাই হয়ে উঠেছিলেন। বাঙালী আর মুজিব ভাই সম্পর্কের ভীত সত্যিই ভীষণ শক্তিশালী। ৭০ এর নির্বাচনের আগে রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন আমি আপনাদের নেতা নই, আমি আপনাদের মুজিব ভাই, আপনাদের সংগ্রামের সাথি।

বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তের পর তাকে ছোট-বড় সকলেই বঙ্গবন্ধু বলে ডাকতেন। কেউ যদি মুজিব ভাই বলে ডাকতেন তবে বঙ্গবন্ধুর চোখে মুখেই আনন্দের ছাপ দেখা যেত। মুজিব ভাই ডাকে তিনি নিজেকে ৬৬ এর ৬ ছাফার সময়কালের উত্তাল দিনগুলির সংগ্রামী মুজিব ভাইকে খুঁজে পেতেন। জাতির জনক হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্কে বলেছিলেন, সে তোমাদের কাছে জাতির জনক কিন্তু আমার কাছে সে এখনো ছোট্ট খোকা। মানুষের অবস্থান বদলে গেলেও কিছু অপরিবর্তনীয় সম্পর্কের আবেগ থাকে। মুজিব ভাইয়ের সাথে বাঙালির অন্তরঙ্গ সম্পর্কের সেই আবেগ শোষকের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম আর চিরায়ত বাঙালি চরিত্রে ভাইয়ের ন্যায় আত্মিক সম্পর্কের আবেগ।

যে আবেগ কোন দিক থেকেই একপাক্ষিক না বরং বাঙালি ও মুজিব ভাইয়ের হৃদয় দিতে অনুভূত আবেগের ফসলই হল আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।

শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর কাজের স্মীকৃতি হিসাবে নানা উপাধি পেয়েছেন নানা বিশেষণে বিশেষায়িত হয়েছেলে। বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা উপাধি ছাড়াও শেখ সাহেব বাঙালির রাখাল রাজা হিসাবেও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।

নেতা বা ভাই যে নামেই ডাকা হোক মুজিব ভাই সেই মানুষ যিনি বাঙালির মুক্তির জন্য বাংলার মাঠ-ঘাটে রাত-দিন খেয়ে না খেয়ে কর্মীদের সাথে সময় দিয়েছেন, মিছিল মিটিং করেছেন। ট্রেন, বাইসাইকেল, নৌকায় বা পায়ে হেঁটে কর্মীদের কাছে কাছে গিয়ে সভা সমাবেশ আয়োজন করে স্বাধীনতার মুক্ত আকাশ দেখার স্বপ্ন দেখানো মানুষটি আমাদের মুজিব ভাই। কর্মীর সুখ-দুঃখের খোঁজ রেখে পারিবারিক সম্পর্কের আবহে গোটা বাঙালি জাতিকে মুক্তি সমগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করতে অবিভাবক চরিত্রের মানুষটি হলেন আমাদের মুজিব ভাই।

মুজিব ভাইকে আমাদের প্রজন্মের দেখার সুযোগ হয়নি তবে তাঁর সভা সমাবেশের বক্তৃতা, লেখনি আমাদের জীবনবোধকে জাগ্রত করে দেশপ্রেমিক হতে। তবে বাঙ্গলির ভাগ্যের অনিশ্চিত যাত্রার ধ্বংসস্তুপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের স্রষ্টা মুজিব ভাইয়ের রক্তের সুযোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনার দৈনন্দিন সংগ্রাম ও রাজনৈতিক সফলতার বর্তমান সময়ের চিত্র বাংলাদেশের উন্নয়নের সাক্ষী আমরা। স্বাধীনতার সুবর্ন জয়ন্তী পালনের মাহেন্দ্রক্ষণে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যে উৎসব চলছে সেই উৎসব আমাদের কাছে মুজিব ভাইয়ের জন্মশতবর্ষে তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখের বেটি, শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বাঙালি জাতির জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার উৎসব।

আমাদের বাঙালিদের ভাত কাপড়ের অভাব ছিলো একদিন, পৃথিবীর বিপরীতে আমাদের পিছিয়ে যাওয়ার গল্প ছিলো গরীব দেশ হিসাবে। সেই সকল সমীকরণ বদলে দিয়ে পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তির পথে পিছিয়ে যাওয়া বা স্থির থাকার পরিবর্তে ক্রমাগত অগ্রগতির রোল মডেল হওয়ার পেছনে যে মানুষটির আজীবনের সংগ্রাম আদর্শ ও স্বপ্ন অনুপ্রেরণা দেয় তিনি আমাদের মুক্তির মহানায় মুজিব ভাই।

লেখকঃ উপ বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত