বঙ্গবন্ধু, বাঙালি ও বাঙালির বাঁচার দাবি

1104

Published on জুন 7, 2021
  • Details Image

সরকার মোঃ সব্যসাচী:

ধরণীর বুকে লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে বাংলাদেশ ভূমিষ্ঠ হয়েছিলো যাঁর হাতে হাত রেখে –সে নামটি হলো শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁর যাপিত জীবনদর্শন পাঠ করলে সন্ধান মেলে বাংলাদেশ ভূমিষ্ঠের অমর ইতিহাস। চোখে দৃশ্যমান হয়, পাকিস্তানের বুক চিরে বাঙালির স্বাধীনতার অংকুরায়নের সংগ্রামী প্রতিচ্ছবি। প্রসঙ্গতই, বঙ্গদেশের পূজনীয় ইতিহাসবিদরা ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ' শব্দ দুটিকে আলাদা করতে পারেনি। শব্দ দুটি বকুলের মালার মতোই আমাদের মানচিত্রের জন্মের ইতিহাসকে সুরভি করে তোলে। শব্দ দুটি যে এক আর অবিভাজ্য। তাইতো, শব্দ দুটি থেকে ছড়ায় মায়াভরা সৌরভ।

বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন টুঙ্গিপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। যে পরিবারের অতীত হাতড়ালে মিলবে গৌরবময় দৃশ্যপট। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সুকান্তের কবিতার মতোই ‘জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়’ বঙ্গবন্ধুর পরিবারের পূর্বপুরুষদের সংগ্রামী চেতনা ইতিহাসের পাতায় বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরষদের দ্যুতিময় করে রেখেছে। পরিবারের এ গৌরবান্বিত অতীত পাঠ করেছেন বঙ্গবন্ধু। তাই শেখ মুজিবুর রহমানের খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু হবার দুর্গম অভিযাত্রার সংগ্রামকে খানিকটা হলেও এ অতীত ঋদ্ধ করেছে। নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুকে এ অতীত জুগিয়েছে সাহস আর অনিঃশেষ প্রেরণা। বঙ্গবন্ধু কৈশোরেও ছিলেন তাঁর ভাষণের মতোই দুর্বার। বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোবার আগেই তিঁনি ছুঁয়েছিলেন নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জনের রেখা। শুধু নেতৃত্বই নয়, কিশোর কালেই নিজের মাঝে জাগিয়েছিলেন মানবতাবোধ। হামিদ স্যারের সাথে বাড়ি বাড়ি থেকে চাল সংগ্রহ করে এবং সে চাল বিক্রি করে গরীব ছেলেদের লেখাপড়ার খরচ চালানো –মননে মানবিক বোধের উন্মেষ না হলে এ কাজ অসম্ভব।

বঙ্গবন্ধু -আমরা তাঁকে স্মরণে সম্বোধন করি জাতির পিতা বলে। তো তিঁনি কেমন পিতা? আমরাই তাঁর কেমন সন্তান? যোগ্য নাকি অযোগ্য? মনের অজ্ঞাত বশেই মনে এরকম প্রশ্নের উদয় হয়। আমরা হাতড়াই ইতিহাস। ইতিহাস তার অগণিত দলিল দিয়ে প্রমাণ করে দেয় শেখ মুজিব বাঙালি জাতির পিতা। যে পিতা তাঁর সন্তানসম এ জনপদের জন্যে দিনের পর দিন পীড়ন যন্ত্রণা সহ্য করে কারাগারের প্রকোষ্ঠে দিনাতিপাত করেছে। বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে মুক্তি দিতে রক্ষাকর্তার মতো উদিত হয়েছিলেন বাঙালির মনে-মনে। স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন অনেকেই। তবে ত্যাগ-তিতিক্ষা-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আর কেউ বঙ্গবন্ধুর মতো বাঙালির কোমল হৃদয়ে ঠাঁই নিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু যিনি কলকাতার বেকার হোস্টেলে থাকাকালীন সময়ই বুনেছিলেন বাংলার স্বাধীনতার স্বপ্ন। সযত্নে তা রেখে দিয়েছিলেন মননে-মগজে। অকালে উন্মোচিত করে বিনষ্ট করেননি সোনালী স্বপ্নকে। পাক সরকারের রাক্ষস-খোক্কসদের অট্টহাসিকে উপেক্ষা করে এগিয়ে গেছেন তিঁনি স্বপ্নের সাথে। ক্রমে-ক্রমে গর্জনে-সংগ্রামে বিকশিত করেছেন স্বপ্নকে। সে স্বপ্ন স্বাধীন বাংলা গড়ার, সোনার বাংলা গড়ার।

ছয় দফা ছিলো স্বাধীন বাংলা গড়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর দর্শনাতীত এক হাতিয়ার। পশ্চিমাদের রক্তচক্ষু যেমন পাকিস্তানকে ভীত করে তোলে তেমনি বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা পাকিস্তানের শাসকদের পায়ের তলার মাটিতে কম্পন তৈরি করেছিল। এমনকি যেদিন লাহোরে বিরোধীদলীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণা করলেন তার পরবর্তীতে পাকিস্তানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ‘নওয়াই ওয়াক্ত' এই সংবাদের শিরোনাম করলেন এভাবে ‘শেখ মুজিবকা ছয় দফা খতরনাক'। ছয় দফা ছিলো বাঙালির মুক্তির সনদ। তাই এটাকে আখ্যায়িত করা হয়েছিল ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ নামে। মুক্তির এ সনদকে প্রাণময় করতে কার্পণ্য করেনি বাঙালি। এ যে বাঙালির বাঁচার দাবি। রক্তের বন্যা বয়ে দিয়েছে শৃঙ্খলমুক্ত হবার আশায় ক্ষুধাতুর বাঙালি। অসংখ্য শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ছয় দফা।

রক্তে পূত-পবিত্র হয়ে ছয় দফা ছড়িয়ে গিয়েছিল তেতুলিয়া থেকে টেকনাফ। দীর্ঘদিনের পরাধীন বাঙালি পরাধীনতার শেকল ভাঙার স্বাদ পেয়ে গর্জে উঠেছিল সেদিন। গর্জে উঠেছিল সারা বাংলাদেশ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির এ বাঁচার দাবিকে রুখে দিতে মামলা-হামলা শুরু করলো। বঙ্গবন্ধুকে নিক্ষেপ করলো কারাগারে। কিন্তু তাতেও দ্রোহের আগুন নিভেনি। কারণ বঙ্গবন্ধু সারা বাংলা চষে বেড়িয়ে বাঙালির মানসে যে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন তা নেভানো দুরূহ। এদিকে যখন বাঙালির গর্জন বন্ধ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, ছয় দফা হয়ে উঠেছিল অপ্রতিরোধ্য —তখন বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাবার পরিকল্পনা নিয়ে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলা দেয়। বঙ্গবন্ধুর উপরে চালানো হয় নির্মম পাশবিক নির্যাতন। কারণ তারা জানতো বাঙালির মানসে যে আগুন দাউদাউ করে জ্বলছিলো সে আগুনের বাতিঘর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই তারা বাঙালির মানসপটের আগুনকে ছাইচাপা দিতে বঙ্গবন্ধুর শ্বাসরোধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যে ফিনিক্স পাখি। যতোই তাঁকে পোড়াবে, যতোই নির্যাতন করবে, ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাতে চাইবে —ততোই বাঙালির মানসে জ্বালানো বঙ্গবন্ধুর আগুন জ্বলবে আরো দাউদাউ করে‌। তাইতো তারা বেশীদিন আটকে রাখতে পারেনি বঙ্গবন্ধুকে। বাংলার মানুষের প্রতিবাদ শক্তির কাছে মাথানত করতে হয়েছে শাসকগোষ্ঠীকে। সসম্মানে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে হয়েছে। বাংলাজুড়ে ছয় দফার জন্যে বাঙালির দ্রোহের উত্তাপ পরবর্তীতে টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবকে পরিণত করেছিল বঙ্গবন্ধুতে। কিন্তু শেখ মুজিব শুধু বন্ধুর দায়িত্ব পালন করেননি, পিতার দায়িত্বও পালন করেছেন।

কালের বিবর্তনে পরাধীন হয়ে যাওয়ার এ ভূখণ্ডকে স্বাধীন দেশ হিসেবে ধরণীর মানচিত্রের বুকে ঠাঁই দিতে বঙ্গবন্ধু ছুটেছেন সারা বাংলায় হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো। তিঁনি যেখানেই গেছেন দরাজ কন্ঠের আপন বুলিতে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন জনগণকে। বাঙালি যেন তাঁর বচনেই চোখে সোনালী আগামীর চিত্রপট চিত্রায়ন করতে পারতো এক নিমিষেই। তাইতো ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন বললেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” তখনই প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। সারা বাংলাদেশ সেদিন বঙ্গবন্ধুর ডাকে জড়ো হয়েছিলো রেসকোর্স ময়দানে। পিতা যেমন সন্তানকে বিজয় ছিনিয়ে আনার আদেশ দেয় আর সন্তান সে আদেশ পালন করে তেমনি বঙ্গবন্ধুর আদেশে সমগ্র জনতা সন্তানের মতো সেদিন পিতার কাছে শপথ করেছিল স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনবেই। এবং এনেছিল। অস্ত্রে-বারুদে সুসজ্জিত পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে খালি হাতে যুদ্ধ করেছে বাঙালি। বাঙালির ছিল শুধু বুকভরা সাহস আর অবিচল বিজয়ের লক্ষ্য। বাঙালি স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছে এক সাগর, তবু পিছু ফিরে তাকায়নি অকুতোভয় এ জাতি। সমুখে যুদ্ধ করে ছিনিয়ে এনেছে বিজয়।

স্বাধীন হলাম আমরা। যুদ্ধবিধ্বস্ত আমাদের দেশ পরিণত হলো ধ্বংসস্তুপে। সবুজ-সুফলা বাংলাদেশের যুদ্ধের দামামায় বিপর্যস্ত রূপের ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধুর শুরু হলো সোনার বাংলা বিনির্মাণের যাত্রা। শুরু হলো জাতির পিতার সোনার বাংলা তৈরীর নিরন্তর সংগ্রাম। যে সংগ্রাম যুদ্ধাহত বাংলাকে ধরণীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাবার সংগ্রাম। নিজের সন্তানের মতোই লালন করে তিঁনি বাংলাদেশকে দিতে চেয়েছিলেন সুন্দর আগামী। কিন্তু দূর্ভাগ্য আমাদের যে, চালকের আসনে আমরা তাঁকে পেয়েছি মাত্র ১৩১৪ দিন। তিঁনি সর্বোচ্চটুকু দিয়ে পালন করেছিলেন পিতার দায়িত্ব। কিন্তু আমরা কি পেয়েছিলাম তাঁর সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে? যদি পালন করতে পেরেছিলাম তবে কেন আমাদের জাতির পিতা সপরিবারে নিজ বাড়িতে নিহত হলেন? এই সময়ে এসেও কতিপয় বাঙালি কিভাবে পিতার মৃত্যুদিনে জন্মোৎসব পালনে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠে? এসব সন্তানের জন্য পিতা এনেছিলেন স্বাধীনতা? প্রশ্ন আসে, তবে প্রশ্নের ওপাশ থেকে উত্তর আসে না। নিস্তব্ধতা আঁকড়ে রাখে তাদেরকে। যেন জাতির সেসব সন্তান এসব প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হয়ে বাকশক্তিহীন হয়ে ওঠে। তাদের মুখে আমার একদলা থুথু।

বঙ্গবন্ধু, যাঁর জীবনদর্শন আমাদেরকে মানুষের জন্য মানুষ হয়ে বাঁচার তাগিদ দেয়। আমাদের উচিত সে তাগিদ নিয়ে জাতির সুন্দর আগামী গড়ার অভিযাত্রায় অংশগ্রহণ করা। বাঙালিকে সাথে নিয়ে জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার যে পরিকল্পনা ছিল সে অসম্পূর্ণ পরিকল্পনাকে পূর্ণতা দিতে বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের তরে পদযাত্রায় আমাদের সবাইকে সামিল হতে হবে। সমৃদ্ধ আগামীকে অর্জনের জন্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা লাল-সবুজের নিশান উড়িয়ে তরণীতে করে আলোকিত আগামীর পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। এ তরণী যে বঙ্গবন্ধুর, এ তরণী যে গণমানুষের। আলোয় ভরা সে তরণীকে বয়ে নিতে হবে আমাদেরকে সারা বাংলাজুড়ে। তবেই তো দেখা যাবে —হে জাতির পিতা, আমরা তোমার কেমন সন্তান।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ময়মনসিংহ জেলা।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত