আওয়ামী লীগের ৭৭ বছর : যে ইতিহাস বিশ্বের অস্বীকার করার অবকাশই নেই

2059

Published on জুন 22, 2026
  • Details Image

সাতাত্তর বছর। বাংলাদেশের জন্মের চেয়েও দীর্ঘ এই পথচলা। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পেছন ফিরে তাকালে যা দেখা যায়, তা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়, বরং একটি জাতির অস্তিত্বের লড়াই, একটি ভূখণ্ডের ক্রমশ মাথা তোলার গল্প।

স্বাধীনতার রক্তাক্ত ভোরে যে দল দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই দলই পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলাদেশকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তা আজ আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত। ২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজনীতির পট যেভাবে পালটেছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই অর্জনগুলো নিয়ে কথা বলা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে।

১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ : যে মাটি থেকে জন্ম

১৯৪৯ সালে এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের জন্ম। সেই দল ভাষার জন্য লড়েছে, মানুষের অধিকারের জন্য লড়েছে। এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি নতুন দেশের জন্ম দিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই ভূমিতে টিকে থাকাটাই ছিল তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

২০০৯ থেকে ২০২৪ : রূপান্তরের দেড় দশক

২০০৯ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন ফের ক্ষমতায় ফিরলেন, দেশের চিত্রটা মোটেই সুখকর ছিল না। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে বিনিয়োগ পালিয়েছে, অবকাঠামো পড়েছে মুখ থুবড়ে, আর সুশাসনের নামে চলেছে দায়মুক্তির সংস্কৃতি। সেই ভঙ্গুর অবস্থান থেকে বাংলাদেশকে টেনে তোলার কাজ শুরু হয়েছিল সেদিন থেকে।

পরের পনেরো বছরে যা ঘটেছে, তাকে 'রূপান্তর' বললে হয়তো কমই বলা হয়।

২০০৯ সালে যে দেশের জিডিপি ছিল ১০২ বিলিয়ন ডলার, পনেরো বছরে সেটা গিয়ে ঠেকেছে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি। মাথাপিছু আয় ৭৫৯ ডলার থেকে ২,৭০০ ডলার পেরিয়েছে, মানে একটা প্রজন্ম কার্যত গরিব ঘরে জন্মে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন দেখার সুযোগ পেয়েছে। দারিদ্র্যহার ৩১ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ১৮-তে, চরম দারিদ্র্য আটকে গেছে সাড়ে পাঁচের ঘরে। আর বিদ্যুৎ? ২০০৯ সালে উৎপাদন সক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের কম। সেটা এখন আটাশ হাজার ছুঁয়েছে। যে গ্রামে সন্ধ্যা হলে কুপিবাতি জ্বলত, সেখানে এখন বৈদ্যুতিক আলোতে ঝলমল করছে।

সংখ্যাগুলো শুধু খটমটে, নিরস পরিসংখ্যান নয়, এগুলো লক্ষ লক্ষ পরিবারের বদলে যাওয়া জীবনেরই গল্প।

ইট-পাথরে গড়া উন্নয়নের অঙ্গীকার

এ প্রসঙ্গে পদ্মা সেতুর কথা আলাদা করে বলতে হয়। বিশ্বব্যাংক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা সরে দাঁড়িয়েছে, রাজনৈতিক চাপ ছিল চারদিক থেকে। তবু নিজের টাকায় সেতু বানিয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ-পশ্চিমের ২১টি জেলা, যারা দশকের পর দশক বিচ্ছিন্ন ছিল, তারা হঠাৎ ঢাকার কাছে চলে এল। জিডিপিতে যোগ হলো আনুমানিক ১.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।

ঢাকার যানজটে নাকাল মানুষের জন্য এলো মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে উঠল দীর্ঘমেয়াদি শক্তিনিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে। বঙ্গবন্ধু টানেল চট্টগ্রামকে দিল নতুন মাত্রা।

একসময় যে দেশের গ্রামে রাত নামলে আঁধার নামত, সেই দেশে ২০২৪ সালে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে গেছে প্রায় ঘরে ঘরে।

কেবল দৃশ্যমান উন্নয়নই নয়, মানুষও বদলেছে

'ডিজিটাল বাংলাদেশ' ধারণাটি একসময় অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো ঠেকেছিল। কিন্তু মোবাইল ব্যাংকিং থেকে ইন্টারনেট সংযোগ, প্রযুক্তির সুবিধা সত্যিকার অর্থেই সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে।

মেয়েরা স্কুলে গেছে, কলেজে গেছে। শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, মায়েরা বেঁচে ফিরছেন সন্তান জন্ম দিয়ে। পোশাকশিল্পে লাখো নারী শ্রমিক কেবল উপার্জন করেননি, নিজেদের একটা অর্থনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছেন। সামাজিক সুরক্ষার জাল বিছানো হয়েছে প্রান্তিক মানুষের জন্য। দেশ আর বিদেশি সাহায্যের দিকে তাকিয়ে বসে নেই, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ভরসা তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বারবার বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে টেনে এনেছেন। অনুন্নত বিশ্বের জন্য এটি একটি পথের নাম হয়ে উঠেছিল।

৫ আগস্টের পর যা ঘটছে

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দৃশ্যপট পালটে গেছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা গ্রেপ্তার হচ্ছেন, নির্যাতিত হচ্ছেন। দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যে দল একটি দেশকে স্বাধীন করেছে, সেই দলের অস্তিত্ব আজ প্রশ্নের মুখে।

এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, খুব সরল কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে অনেক ওজনদার, একটি জাতি কি তার নিজের ইতিহাসকে অস্বীকার করতে পারে?

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়

৭৭ বছরের এই যাত্রা শুধু একটি দলের গল্প নয়, এটি একটি জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম ও উত্থানের গল্প। যে নেতৃত্ব এই পরিবর্তন এনেছে, তার প্রতি ন্যায়বিচার এবং যে দেশটি এই পথ পেরিয়ে এসেছে, সেই দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্ব।

ইতিহাস মুছে দেওয়া যায় না। উন্নয়নের এই রেখাচিত্র কোনো আদেশে বদলায় না। বাংলাদেশ এগিয়েছিল। সেই এগিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতিটুকু অন্তত থাকুক।⁩

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত