112
Published on জুন 23, 2026বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, জাতীয় চেতনা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং উন্নয়নের ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। আজ ২৩ জুন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৪৯ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠিত দলটি পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে গণমানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি জাতীয় অর্জনের সঙ্গেই আওয়ামী লীগের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সংবিধান প্রণয়ন, প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ভিত্তি স্থাপন ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ঐতিহাসিক সাফল্য। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং পরবর্তীতে জাতীয় চার নেতাকে কারাগারে হত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হয়। এর ফলে বাংলাদেশ দীর্ঘ সামরিক শাসন, ইতিহাস বিকৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্যুতির এক অন্ধকার অধ্যায়ে প্রবেশ করে।
এই সংকটকালেই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জনগণের ভোটাধিকার এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবারও গণমানুষের আস্থার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অবকাঠামো, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ডিজিটাল বাংলাদেশ, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন, জলবায়ু কূটনীতি এবং রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয়—এসব উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। একসময়ের সাহায্যনির্ভর বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়ন ও সম্ভাবনার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
বৈশ্বিক শক্তিগুলো বিভিন্ন সময় বাংলাদেশকে নিজেদের প্রভাববলয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সর্বদা আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—রাষ্ট্রের স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি।
সেন্ট মার্টিনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষাপটে তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন—ক্ষমতায় থাকার বিনিময়ে বাংলাদেশের কোনো ভূখণ্ড, সম্পদ বা সার্বভৌম স্বার্থ কারও কাছে সমর্পণ করা হবে না। একই সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ড কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে না। পাশাপাশি তিনি সংবিধানসম্মত গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেছিলেন, জনগণের ভোটই ক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস।
পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি "সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়" নীতিকে সমসাময়িক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করেছেন। ব্রিকসে (BRICS) যোগদানের আগ্রহও ছিল অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিকল্প সম্প্রসারণের একটি কৌশলগত উদ্যোগ, যাতে বাংলাদেশ বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নতুন বাজার ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
আমার রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতায় উপলব্ধি করেছি—রাষ্ট্রনায়কের প্রকৃত পরীক্ষা হয় সংকটের মুহূর্তে। জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান রক্ষায় দৃঢ় অবস্থানই একজন নেতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি শক্তি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় আত্মপরিচয়কে দুর্বল করার অপচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মাধ্যমে তারা নিজেদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। ঘটনাবহুল ওয়ান-ইলেভেনেও তারা সফল হয়নি। কিন্তু ২০২৪ সালে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা ফেক নিউজ ও এআই-নির্ভর মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে জুলাই ২০২৪-এর ঘটনাপ্রবাহ সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছে। এই ঘটনাবলির উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা।
ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ড, বিদেশি প্রভুদের খুশি করতে দেশ বিক্রির গোপন চুক্তি সম্পাদন, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সমর্থকদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অদক্ষতা ও খামখেয়ালিপনা নিয়ে যে সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে, তা এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে। ইউনুস গং এবং তাদের বিদেশি প্রভুদের এদেশীয় এজেন্টরা দেশ বিক্রির মুচলেকা দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে দেশের স্বার্থবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল; আর বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তাদের মিত্ররাও সেই ধারা অব্যাহত রেখেছে।
বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বিএনপি ও তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের বিরুদ্ধে একই ধরনের দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখার অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অর্থনৈতিক সংকট, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা, চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা, উগ্রবাদের প্রসার, সংস্কৃতির ওপর আঘাত এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তির ওপর দমন-পীড়নের বিষয়গুলোও আজ সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে।
তারা বাংলাদেশের অধিকার আদায়ের গণমানুষের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে অন্যায়ভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ মানুষের ঐতিহাসিক স্লোগান ‘জয় বাংলা’-কেও নিষিদ্ধ করেছে। কারণ তারা জানে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের কাছে আওয়ামী লীগ একটি আবেগের নাম, আর ‘জয় বাংলা’ ইতিহাসের অনুপ্রেরণার প্রতীক। এ কারণেই তারা আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তাকে ভয় পায়।
দেশের গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেই এ দেশের মানুষের কল্যাণে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অভিযাত্রা এগিয়েছে।
আওয়ামী লীগ আজও তৃণমূল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ-কষ্ট ও সংগ্রামের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আওয়ামী লীগের পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। কারাবরণ, দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নানামুখী ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়েই দলটি প্রতিবার জনগণের শক্তিকে ভিত্তি করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এই সংগঠনের শিকড় প্রোথিত রয়েছে বাংলার মাটি, মানুষ এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে।
৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রত্যাশা—বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় হোক। সকল প্রতিকূলতা ও ষড়যন্ত্রের অন্ধকার অতিক্রম করে, ইনশাআল্লাহ জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবারও স্বমহিমায় ফিরে আসবে এবং দেশের অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দেবে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গঠনে সকল দেশপ্রেমিক নাগরিক ঐক্যবদ্ধ হোন।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
লেখকঃ মাহমুদ হাসান রিপন; সাবেক সংসদ সদস্য এবং সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ