20
Published on জুলাই 6, 2026“বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই”—২০২৪ সালের জুলাই মাসে এই পবিত্র ও ন্যায়সঙ্গত স্লোগানকে বুকে ধারণ করেই দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল। আন্দোলনটি ছিল সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, শান্তিপূর্ণ এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার এক লড়াই। কিন্তু পর্দার আড়ালে ওত পেতে থাকা একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও তাদের আন্তর্জাতিক প্রভুরা যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই সরল আবেগকে পুঁজিতে পরিণত করবে, তা হয়তো তরুণ সমাজ তখন কল্পনাও করতে পারেনি।
যখনই দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়ে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সমাধান ও কোটা বাতিল করলেন, তখনই চক্রান্তকারীদের আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে গেল। তাদের লক্ষ্য কোটা সংস্কার ছিল না; তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিদেশি শত্রুদের হাতে বিকিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল করা। যা আমাদের সেই পুরোনো মীরজাফরের কথা মনে করিয়ে দেয়। যিনি একটু ক্ষমতার লোভে ২০০ বছরের জন্য ইংরেজদের হাতে তুলে দিয়েছিলো এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব।
২৪শে জুলাইয়ের সেই দিনগুলোতে মাঠে নামে জামাত-শিবির এবং তাদের পেইড 'বট বাহিনী'। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুনিপুণভাবে গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে, একের পর এক কৃত্রিম লাশের নাটক সাজিয়ে তারা সাধারণ জনগণকে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। বিদেশি অর্থায়নে ও আন্তর্জাতিক এজেন্সির পুতুল হিসেবে কাজ করা এই উগ্রপন্থী গোষ্ঠী একটি শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনকে রাতারাতি রূপান্তরিত করে এক ভয়াবহ সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী আন্দোলনে। যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল পুলিশ হত্যা এবং মেট্রোরেল, বিটিভি ভবন ও ডাটা সেন্টারের মতো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করা।
একটু পেছনে ফিরে তাকালেই চক্রান্তকারীদের দ্বিচারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৪ঠা আগস্টের দিন পর্যন্ত এই দেশদ্রোহী চক্র সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য ছদ্মবেশ ধারণ করেছিল। তারা ব্যবহার করেছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, জাতীয় পতাকা, আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি, দেশপ্রেম, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র স্লোগান পর্যন্ত। অথচ, ৫ই আগস্টের পর থেকে আজ পর্যন্ত এই স্বাধীন বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রকৃত দেশপ্রেমিক জনগণের সাথে কী করা হয়েছে—তা আজ আর কারও অজানা নয়। ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে এরা প্রথমেই আঘাত হেনেছে বাঙালির অহংকার বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ও ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে। মুখে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বললেও ৫ই আগস্টের পর দেশজুড়ে শুরু হয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘুদের ওপর বর্বর নির্যাতন।
এই চক্রান্তের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয় যখন জামাত-শিবির ও বিএনপির পেছনের চালিকাশক্তিরা আন্ডারওয়ার্ল্ডের তালিকাভুক্ত চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং সাজাপ্রাপ্ত উগ্রবাদী জঙ্গিদের মুক্ত করার জন্য 'বন্দিমুক্তি'র গোপন চুক্তি করে। এর ফলশ্রুতিতেই আমরা দেখেছি দেশের বিভিন্ন কারাগারে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে লুণ্ঠন ও আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনা। এই ষড়যন্ত্র সফল করতে দেওয়া হয়েছিল আনলিমিটেড অবৈধ অস্ত্রের যোগান। আর দেশি-বিদেশি নির্দিষ্ট কিছু এনজিওর মাধ্যমে ব্যাপক হারে কোটি কোটি টাকার অর্থায়ন করা হয়েছিল—যা স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যেই বিশ্বের সামনে পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
আজ সাধারণ মানুষের মনে একটাই বড় প্রশ্ন—শিক্ষার্থীদের সেই কাঙ্ক্ষিত ‘বৈষম্যহীন’ বাংলাদেশের চাহিদা বর্তমান প্রশাসন কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে? বাস্তবতা হলো, জনগণের প্রাপ্তির খাতা আজ শূন্য। কিছুই হয়নি, উল্টো দেশে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে বৈষম্য আকাশচুম্বী হয়েছে। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের কোনো নিরাপত্তা নেই; চারদিকে চলছে আইনহীনতার রাজত্ব, অরাজকতা, গুম, খুন এবং ধর্ষণের মহোৎসব। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, আর দেশের অর্থনীতি আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। যে সার্বভৌমত্বের সুরক্ষার কথা বলে তারা ক্ষমতা আঁকড়ে ধরেছে, আজ সেই সার্বভৌমত্বই সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে।
একটিবার পেছনের সোনালী দিনগুলোর দিকে তাকান। জননেত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে কেউ কি একটিবারের জন্যও কোনো দেশবিরোধী বা দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্নকারী চুক্তি দেখাতে পারবে? পারবে না। তাঁর আমলে এভাবে প্রকাশ্যে বিচারহীনতার কালচার, ঢালাও লুটপাট, চাঁদাবাজি কিংবা বিরোধী মত দমনের নামে এমন বর্বরতা কেউ দেখাতে পারবে? পারবে না। কারণ, তখন দেশের শাসনভার ছিল প্রকৃত দেশপ্রেমিকের হাতে, যিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে কখনো বিকিয়ে দেননি।
আর আজ? আজ দেশ হলো স্বাধীনতা বিরোধী পুরোনো শকুনের হাতে। বিদেশি অর্থায়নে জামাত-শিবিরের চক্রান্ত আর গুজবের ওপর ভর করে যে সন্ত্রাসী তাণ্ডব চালানো হয়েছিল, তার শেষ পরিণতি আজ দেশবাসী দেখছে। ক্ষমতার চেয়ার টিকিয়ে রাখতে আজ বৈদেশিক শক্তির সাথে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব বিক্রির গোপন চুক্তি করা হয়েছে। আর এই সুযোগে জামাত-শিবির ও বিএনপি মিলে দেশের অর্থনীতি চুষে খাচ্ছে, মেতে উঠেছে লুটপাটের মহা উৎসবে।
সাধারণ মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে যারা আজ বাংলাদেশকে এক অন্ধকার অতল গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে, যারা নিজ দেশের মাটি ও সার্বভৌমত্ব পরোক্ষভাবে বিদেশি প্রভুর হাতে তুলে দিয়েছে, তাদের মুখোশ আজ জনগণের সামনে সম্পূর্ণ উন্মোচিত। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, এই আধুনিক মীর জাফরদেরও করবে না। সময় এসেছে দেশপ্রেমিক জনগণকে আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, চক্রান্তকারীদের হাত থেকে প্রিয় মাতৃভূমিকে রক্ষা করার।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখকঃ রাব্বি হাসান , শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়; সংগঠক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।