209
Published on আগস্ট 5, 2026বিপদে-আপদে, দুঃসময়ে স্মৃতিতে ভেসে ওঠে কোনো প্রিয় মুখ কিংবা মনে পড়ে কোনো প্রিয় নাম। জাতি আজ চরম দুঃসময়ে, ব্যক্তি মানুষেরও বড় দুর্দিন। বড় দুর্দিন দেশমাতৃকার। একাত্তরের ঘাতকেরা, শেয়াল-শকুনেরা এই দেশটাকে আবার ছিঁড়ে খুঁড়ে একাকার করে দিচ্ছে। হৃৎপিণ্ড ছিড়ে রক্ত ঝরাচ্ছে। জাতির এমন দুর্বিষহ দুঃসময়ে কিছু প্রিয় নাম, কিছু প্রিয় মুখ ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে। তেমনি একটি নাম শেখ কামাল। বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাহসী সৈনিক শেখ কামালের প্রিয় মুখটি বারবার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে।
বুক জুড়ে কেবলই যেন হাহাকার। কত দিন হয়ে গেল দেখি না তাঁকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণচঞ্চল ক্যাম্পাসে তিনি নেই। নেই ছাত্রলীগ কিংবা যুবলীগের অফিসে। হৃদয় খুঁজে ফেরে প্রাণোচ্ছল সেই মানুষটিকে। এক সময় যার সান্নিধ্য হৃদয় মাতাল করে রাখত, আজ কোথাও তাঁর দেখা মিলে না। দীর্ঘ প্রবাসজীবনেও মধ্যে মধ্যে নাড়ির টানে দেশে যাই। ঢাকার ব্যস্ত জনপদে খুঁজি তাঁকে। তিনি নেই। শুধু স্মৃতিতে ভাসে সেই দীপ্তিময় চোখ, হাস্যোজ্জ্বল সেই প্রশান্ত মুখ। সেই মুখ ভুলি কী করে? দৃষ্টির সম্মুখে তিনি নেই, এটা ঠিক। কিন্তু চোখ বন্ধ করলে এখনো দেখতে পাই সেই দীর্ঘ ঋজু দেহ। পুরু গোঁফের নিচে প্রশ্রয়ের স্মিত হাসি। চোখে কালো ফ্রেমের মোটা কাচের চশমা। পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল। এক উচ্ছল তরুণের প্রোফাইল আজও স্পষ্ট হৃদয়ের অ্যালবামে।
১৯৭২ সালের পর থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্য আগস্ট পর্যন্ত এক প্রাণবন্ত সময় কাটিয়েছি আমরা। তারুণ্যের সেই সূচনালগ্নে ভেসেছি প্রাণের উচ্ছ্বাসে। সদ্যঃস্বাধীন দেশে নিয়েছি বুকভরে নিঃশ্বাস। ছাত্ররাজনীতি থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলার মাঠ থেকে নাটকের মঞ্চ- সর্বত্রই ছিল আমাদের প্রাণোচ্ছল উপস্থিতি। সদ্যঃস্বাধীন দেশে আমরা ডানা মেলে উড়ছি তখন। এই আকাশ আমার। এই আলো, এই বাতাস- সব যেন নিজের মতো করে পাওয়া। স্টেডিয়াম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ, টিএসসি থেকে মধুর ক্যান্টিন- আমাদের কলরবে মুখর তখন। আমাদের মুখর তারুণ্যকে প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরিয়ে দেওয়া মানুষটির নাম শেখ কামাল। আমাদের কমান্ডার। হ্যাঁ তাইতো। আমাদের কাছে তো তিনি শেখ কামাল নন। তিনি ছিলেন আমাদের কমান্ডার। এই নামেই তো আমরা চিনতাম, ডাকতাম তাঁকে।
খুব বেশিদিন আগের কথা তো নয়। স্মৃতির সেলুলয়েডে আজও দেখতে পাই, শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ের ঠিক উল্টো দিকে ৩০ মিরপুর রোডে ছিল ছাত্রলীগের অফিস। দোতলা বাড়ির নিচতলায় মহানগর ছাত্রলীগের এবং দোতলায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের অফিসে আমারও তো নিত্য যাতায়াত ছিল। বয়সে কনিষ্ঠ হলেও ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি তখন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রলীগের প্রতিনিধি হিসেবে আমার ওপর এ দায়িত্ব অর্পিত হয়। আজো মনে পড়ে, তখন মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন সৈয়দ নূরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শফিকুর রহমান। ঐ কমিটির সমাজকল্যাণ সম্পাদক মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু বর্তমানে সুইডেনে মূলধারার রাজনীতির সাথে সক্রিয়। তখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ভিপি ছিলেন আমিনুল ইসলাম জিন্নাহ, জিএস ছিলেন ফজলে এলাহী মোহন।
ছাত্ররাজনীতির সাংগঠনিক পরিচয়ের গণ্ডি পার হয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ হতে সময় লাগেনি। আমার দিক থেকে সংকোচ যে ছিল না, তা নয়। সংকোচ ও ভয় দুটোই ছিল। সদ্যঃস্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে তিনি। স্বাভাবিকভাবেই একটি দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথা; কিন্তু কামাল ভাইয়ের ব্যক্তিত্ব ও মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার অসামান্য ক্ষমতা সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে একটুও সময় নেয়নি। ব্যাপারটা শেষাবধি এমন হয় যে প্রতিদিন একাধিকবার দেখা হওয়াটাই ছিল নিয়মিত রুটিন।
শেষ কবে দেখেছি তাঁকে? না, সে হিসাব করা নেই। হিসাব রাখারও তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। রোজ যাঁর সঙ্গে দেখা হচ্ছে, স্মিত হাসি দিয়ে পিঠের ওপর হাত রেখে কাজ করার সাহস জোগাচ্ছেন যিনি- তাঁর সঙ্গে শেষ কবে দেখা হয়েছে, এমন হিসাব কষার তো কোনো প্রয়োজন নেই। কোথায় দেখিনি তাঁকে। সদ্যঃস্বাধীন দেশে তখন আমরা ডানা মেলে উড়ছি যেন। চারদিকে আনন্দের জোয়ার। সেই জোয়ারে তিনি দক্ষ এক সংগঠকের ভূমিকায়। গানের আসরে তাঁকে পাই। নাটকের মঞ্চে তাঁর সপ্রাণ উপস্থিতি। খেলার মাঠে তিনি তো আছেনই। রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয়েও তিনি উপস্থিত। সকালে দেখছি তাঁকে। বিকেলেও সেই হাসিমুখে টেনে নিচ্ছেন কাছে। অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতার অধিকারী এই তরুণ যেকোনো মানুষকে অনায়াসে কাছে টানার শক্তি রাখতেন। জানতেন কী করে সংগঠনকে প্রাণবন্ত রাখতে হয়।
শৈশব থেকে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় উৎসাহী শেখ কামাল স্বাধীনতার পর আবির্ভূত হন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে। উপমহাদেশের অন্যতম ক্রীড়া সংগঠন ও আধুনিক ফুটবলের অগ্রদূত আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। রাজনীতিতে তাঁর অবদান কম নয়। ছাত্রলীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য। শাহাদাতবরণের সময় ছিলেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ১৯৬৯ সালের গণ- অভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার কোর্সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কমিশন লাভ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শাহাদাতবরণের সময় তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এমএ শেষ পর্বের পরীক্ষা দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্য রকম একটা জোয়ার আনার চেষ্টা করেছিলেন শেখ কামাল, বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের চেষ্টা ছিল তাঁর। সরকারের প্রধান নির্বাহী ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির ছেলে হয়েও দলের উঁচু পদের দিকে তাঁর কোনো মোহ ছিল না। সাধারণ কর্মী হিসেবেই কাজ করতেন তিনি। ছিলেন উদ্যমী পুরুষ। সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে খেলার মাঠ-সর্বত্র সমান দাপট।
এই প্রাণবন্ত তরুণ প্রতিভাকে যথার্থ মূল্যায়ন করা হয়নি। মূল্যায়ন দূরের কথা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ তাঁর শিল্পীমনের পরিচয় কজনের জানা আছে? অনেকেই হয়তো জানেন না, শেখ কামাল চমৎকার সেতার বাজাতেন। ছায়ানটের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা- পরবর্তীকালে দেশের সংগীতজগতে পপসংগীতের যে উত্থান, তার নেপথ্যেও শেখ কামালের যে অবদান তাকেও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বন্ধু শিল্পীদের নিয়ে সেই সময়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী’, যে দলটি দেশের সংগীতজগতে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছিল সেই সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে। দেশের নাট্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে শেখ কামাল ছিলেন প্রথম সারির সংগঠক। ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও। অভিনেতা হিসেবেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।
দেশি- বিদেশি ষড়যন্ত্রের সহায়তা নিয়ে আজ আবার স্বাধীনতাবিরোধীরা মাঠ দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। দেশে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে সাম্প্রদায়িক শক্তি। অনবরত চলছে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা। মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা তুলছে। স্বাধীনতার সব স্মারক ভেঙে গুড়িয়ে দিচ্ছে। জয় বাংলা স্লোগান ওরা নিষিদ্ধ করেছে। দেশটাকে আবার পাকিস্তান বানানোর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় বেশি অনুভব করছি শেখ কামালের মতো একজন দক্ষ সংগঠকের। অভাব বোধ করছি তাঁর মতো একজন সাহসী সৈনিকের।
আজ ৫ আগস্ট, জন্মদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেই প্রাণময় তরুণকে, যাঁর প্রেরণা একদিন আমাদের মতো তরুণদের উজ্জীবিত করেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিতে। তিনিই তো আমাদের দীক্ষা দিয়েছিলেন দেশপ্রেমের মন্ত্রে। কামাল ভাইয়ের জন্মদিনে আমাদের শপথ, তাঁর আদর্শের অনুপ্রেরণায় আমরা এগিয়ে যাব। এই বাংলাদেশকে তার সঠিক অক্ষে ফিরিয়ে আনতে হবে। আর সেটিই হবে কমান্ডার কামাল ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সর্বোৎকৃষ্ট পথ।
লেখক : সর্ব ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক