২১ আগস্ট : পৈশাচিক ষড়যন্ত্র বনাম আদর্শিক মানববর্ম

1736

Published on আগস্ট 21, 2026
  • Details Image

আজ ভয়াল ২১ আগস্ট। হিংস্র পৈশাচিক ষড়যন্ত্র আর রাজনীতিতে নূন্যতম শিষ্টাচারেরও বলি হওয়ার দিন। অন্যদিকে আদর্শিক অবিচলতা বজায় রেখে নেতার জীবন বাঁচাতে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে মানববর্ম তৈরী করে নেতাকে রক্ষার দিনও।

একুশে আগস্ট আমাদের সামনে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে- একদিকে প্রতিপক্ষকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করার পৈশাচিক রাজনীতি, আর অন্যদিকে সত্য ও আদর্শিক বিশ্বাসের প্রতি অনুগত নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগের মহিমা। আরো স্পষ্ট করে বললে- বিএনপি জামাতের হত্যা খুন আর ধ্বংসের রাজনীতির বিপরীতে আওয়ামী লীগের ইতিবাচক, সহনশীল, উদার ও গণতান্ত্রিক ভাবধারায় দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ রাজনীতি।

সেদিন ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট, বিকেল পাঁচটা বাইশ মিনিট। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ট্রাকের উপর অস্থায়ী মঞ্চ থেকে তখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে 'জয় বাংলা' স্লোগান- ঠিক তখনই একের পর এক সামরিক মানের গ্রেনেড আছড়ে পড়ে জনসমুদ্রের বুকে। মুহূর্তেই রক্তে ভেসে যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। আইভি রহমানসহ চব্বিশজন নেতাকর্মী প্রাণ হারান, স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হন চার শতাধিক ব্যক্তি। যাঁরা বেঁচে যান, তাঁদের অনেকেই আজও শরীরে বহন করে চলেছেন সেই বিভীষিকার ধাতব স্মৃতিচিহ্ন। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট- বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগরে শীর্ষ নেতৃত্বকে চিরতরে নিশ্চুপ করে দেওয়া।

তবে সেই মৃত্যুর মিছিলেও রচিত হয়েছিল ভালোবাসার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। বিশ্বরাজনীতিতে দেখা যায়, রাষ্ট্রপ্রধান বা রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তায় থাকে বুলেটপ্রুফ গাড়ি, প্রশিক্ষিত বিশেষ বাহিনী, প্রযুক্তিনির্ভর সুরক্ষাবলয়। কিন্তু নেতাকর্মীরা নিজেদের রক্তমাংসের শরীর দিয়ে গ্রেনেড আর বুলেটের মুখে প্রিয় নেত্রীকে ঘিরে যে মানববর্ম রচনা করেছিলেন, তেমন দৃশ্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও সম্পূর্ণ নজিরবিহীন।

মৃত্যু যখন উপর থেকে আছড়ে পড়ছে, তখন কোনো প্রশিক্ষিত বাহিনী নয়, নিছক আদর্শে বিশ্বাসী মানুষ নিজের জীবনের চেয়ে নেতার জীবনকে বড় করে দেখেছিলেন। জীবন বাজি রেখে নেতার জীবন বাঁচানোর এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, আদর্শ ও ভালোবাসার কাছে মৃত্যুর ভয় কতটা তুচ্ছ। ক্ষমতার লোভে নয়, আদর্শের টানে গড়ে ওঠা এই মানববর্ম ছিল একাত্তরের চেতনার প্রতি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি- যে আনুগত্য মৃত্যুর মুখেও পিছপা হয়নি। আগামীতেও হবে না।

হামলার পরও ষড়যন্ত্র থামেনি। প্রকৃত ইন্ধনদাতাদের আড়াল করতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি জামাত সরকার রচনা করে কুখ্যাত 'জজ মিয়া নাটক'- একজন নিরপরাধ যুবককে দিয়ে জোরপূর্বক মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করে প্রকৃত অপরাধীদের বাঁচানোর অপচেষ্টা করা হয়। ইতিহাসের এই কলঙ্কময় অধ্যায় প্রমাণ করে, ক্ষমতায় থাকলে বিএনপি জামাত কীভাবে সত্যকে চাপা দিতে চায়।

২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনার সামনে সুযোগ ছিল প্রতিহিংসার পথ বেছে নেওয়ার। কিন্তু তিনি বেছে নেন আইনের পথ। নতুন করে তদন্ত শুরু হয়, জজ মিয়া নাটকের মুখোশ উন্মোচিত হয়, এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করে। ব্যক্তিগতভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা একজন মানুষ, প্রিয় সহকর্মীদের হারানো একজন নেতা- প্রতিহিংসার বদলে বিচারব্যবস্থার উপর আস্থা রাখার এই সিদ্ধান্তই তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, অসীম সততা আর সবচেয়ে বড় জবাব।

তবে এই বিচারিক অধ্যায়ের গল্প এখানেই শেষ হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর, ওই বছরেরই ডিসেম্বরে হাইকোর্ট ২০১৮ সালের রায়কে অবৈধ ঘোষণা করে তারেক রহমানসহ সব আসামিকে খালাস দেয়; ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আপিল বিভাগও সেই খালাসের রায় বহাল রাখে। অর্থাৎ চব্বিশজন মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সেই ন্যায়বিচার, এক ষড়যন্ত্রমূলক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাত ধরে আইনি বাস্তবতায় আজ আর কার্যকর নেই। যে ইতিহাস দীর্ঘ চৌদ্দ বছরের তদন্ত আর বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা একটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গঠিত আদালতে পাল্টে যেতে দেখা গেলো! এই দ্বৈততাই আজ ইতিহাস আর ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আমাদের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি। কিন্তু এই পটপরিবর্তন শেখ হাসিনার তৎকালীন সিদ্ধান্তের যথার্থতাকে খণ্ডন করে না, বরং প্রমাণ করে, ন্যায়বিচার কতটা রাজনৈতিক ক্ষমতার দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল, এবং তাই এই লড়াই কখনোই একবারের জন্য শেষ হয় না।

এই লড়াই তাই থেমে থাকেনি, থাকবেও না। ২১ আগস্টের ষড়যন্ত্র থেকে শিক্ষা আর নেতাকর্মীদের আদর্শিক অবিচলতায় মৃত্যুভয় তুচ্ছজ্ঞান করা থেকে প্রেরণা নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার আরেকটি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সফল ও সার্থক করতে হবে।
প্রয়োজনে আবারো মানববর্ম তৈরী করে নিজেদের জীবনের বিনিময়ে হলেও মেটিকুলাস গোষ্ঠীর নিশানা থেকে আমাদের আবেগ অনুভুতি সাহস আর আর্দশের ঠিকানা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে সুরক্ষা দিতে হবে- এটাই হোক আমাদের আজকের দিনের দৃঢ় অঙ্গিকার।

লেখক: সাইফুল্লাহ্‌ আল মামুন, সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটি

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত