২১ আগস্ট: আরেক নজিরবিহীন বর্বরতার দিন

3295

Published on আগস্ট 21, 2026
  • Details Image

এম নজরুল ইসলাম

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট- আরেক নজিরবিহীন বর্বরতার দিন। এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের দিন। সেদিন রাষ্ট্রকে ব্যবহার করা হয়েছিল এক নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার লক্ষ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড-বন্দুক হামলা চালানো হয়েছিল। আর এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সাজিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী, রাষ্ট্রের পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের লালিত জঙ্গি সংগঠন মিলেমিশে। আর সেই পরিকল্পনার নেতৃত্বে ছিল কুলাঙ্গার তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৮ বছর বিদেশে পালিয়ে থাকার পর আরেক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সে এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত।

দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১ আগস্ট বিকেলে পুলিশের পাহারার মধ্যে জেএমবির জঙ্গিরা তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার জনসভায় মুহূর্মুহূ গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। গ্রেনেডের বিকট শব্দ আর শত শত মানুষের আর্তনাদে সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে যে বিভিষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। পুলিশ হতাহতদের উদ্ধারের বদলে তাদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে জঙ্গিদের চলে যেতে সহায়তা করেছিল। কি অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতা! শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও রাষ্ট্রীয় মদদে এমন জঘন্য হত্যাযজ্ঞের নজির নেই।

প্রকৃতপক্ষে ২১ আগস্ট বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এটা ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টেরই অসমাপ্ত মিশন। ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করে মিশন সমাপ্ত করতে চেয়েছিল। পরবর্তীকালে এই হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া মুফতি হান্নানের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, হাওয়া ভবনে অনুষ্ঠিত পরিকল্পনা বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর নূরও উপস্থিত ছিল। পিওএফ (পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি) লেখা আর্জেস গ্রেনেড এসেছিল পাকিস্তান থেকে। গ্রেনেড সরবরাহে মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছিল তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন। সেই হত্যাকান্ডের বিচারে যাদের মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন হয়েছিল, ৫ আগস্টের পর তাদেরও মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। বিচারের নামে কি অদ্ভুত পরিহাস! উল্টো বিচারিক স্বৈরাচারের মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে আজ সাজা দেওয়া হচ্ছে।

কী ঘটেছিল সেদিন?
অন্য কোথাও জনসভার অনুমতি না পাওয়ায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে পার্টি অফিসের সামনেই জনসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে মঞ্চ করতে বাধা দেওয়ায় ট্রাকের ওপর মঞ্চ করা হয়। বিকেল হতেই মিছিলের পর মিছিল আসতে থাকে। বিকেল ৪টা নাগাদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষে ভরে যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। ৫টার দিকে সমাবেশস্থলে পৌঁছান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। বক্তৃতায় তিনি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং দেশব্যাপী বোমা হামলা বন্ধে সরকারকে হুঁশিয়ার করেন। প্রায় ২০ মিনিট বক্তৃতা শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল শুরুর ঘোষণা দেওয়ার আগ মুহূর্তে শুরু হয় গ্রেনেড হামলা। একে একে ১৩টি আর্জেস-৮৪ গ্রেনেড ছোঁড়া হয়। পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এরপর শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে চলে অবিরাম গুলিবর্ষণ। কিন্তু নেতাকর্মীরা নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে মানববর্ম তৈরি করেন। এতে অনেকে নিহত বা আহত হলেও প্রাণে রক্ষা পান প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা। আহত মানুষের আর্তচিৎকার, ছড়িয়ে থাকা ছিন্নভিন্ন দেহ, রক্ত আর পোড়া গন্ধ- সব মিলিয়ে বীভৎস অবস্থার সৃষ্টি হয় পুরো এলাকায়। আহতদের সাহায্য করার বদলে বিক্ষুব্ধ এবং আহত মানুষের ওপর বেপরোয়া লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে তৎকালীন সরকারের পুলিশ। আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করে সবাই।

সেদিনের গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মারা যান ২৪ আগস্ট। ওই দিন মোট ২৪ জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। নিহতদের মধ্যে আছেন মোস্তাক আহমেদ সেন্টু, ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, রফিকুল ইসলাম আদা চাচা, সুফিয়া বেগম, হাসিনা মমতাজ রীনা, লিটন মুন্সী ওরফে লিটু, রতন সিকদার, মো. হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মামুন মৃধা, বেলাল হোসেন, আমিনুল ইসলাম, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, আতিক সরকার, নাসিরউদ্দিন সর্দার, রেজিয়া বেগম, আবুল কাসেম, জাহেদ আলী, মমিন আলী, শামসুদ্দিন, আবুল কালাম আজাদ, ইছহাক মিয়া ও অজ্ঞাতপরিচয় আরো দুজন। হামলায় আহতের মধ্যে ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, আমির হোসেন আমুসহ অনেকে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে অনেকে কিছুটা সুস্থ হলেও পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে অনেক নেতাকর্মীকে। সেদিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাঁদের।
নিক্ষিপ্ত গ্রেনেডগুলোর মধ্যে তিনটি অবিস্ফোরিত থেকে যায়। গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রমাণ ধ্বংস করে ফেলা হয়। জজ মিয়া নামে খেটে খাওয়া এক তরুণকে ধরে এনে প্রহসন করা হয়। সেই নাটকে সবকিছুর নাটের গুরু হিসেবে তাকে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। আর এ জন্য তার পরিবারকে কিছু অর্থ দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, শেখ হাসিনাই ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। দেশের মানুষ কি ভুলে গেছে সেসব দিনের কথা? নাকি ভোলা সম্ভব?
জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপর এটাই প্রথম আক্রমণ নয়। এর আগেও একাধিকবার তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়েছে। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পর থেকেই একের পর এক চক্রান্তের শিকার হয়েছেন তিনি। ভয় দেখিয়েও বিরত রাখতে না পেরে তাঁকে হত্যার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রথম সরাসরি তাঁর ওপর গুলি চালানো হয়। লালদীঘি ময়দানে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি বর্ষণ করা হয়েছিল। সেদিনও নেতাকর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে প্রিয় নেত্রীর জীবন বাঁচিয়েছিলেন। সেদিন নিহত হয়েছিলেন সাত জন নেতাকর্মী। আহত হয়েছিলেন তিন শতাধিক। ১৯৮৯ সালের ১১ আগস্ট দ্বিতীয়বারের মতো হামলা হয় তাঁর ওপর। ফ্রিডম পার্টির একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের সহায়তায় ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে মধ্যরাতে গুলিবর্ষণ করে। গ্রেনেড হামলা চালায়। প্রিয় নেত্রী তখন ওই বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। ঘাতকদের অপচেষ্টা সেখানেই থেমে থাকেনি। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আবার আক্রান্ত হন তিনি। উপনির্বাচনের ভোটের পরিস্থিতি দেখতে গ্রিন রোডের ভোটকেন্দ্রে গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির সন্ত্রাসীরা গুলিবর্ষণ ও বোমাবর্ষণ শুরু করে। ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আবার আক্রমণ করা হয় তাঁকে। নাটোর রেলস্টেশনে তাঁকে বহনকারী রেলগাড়ির কামরা লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। ১৯৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর রাসেল স্কয়ারের সমাবেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তখন বিরোধী দলের নেতা। ওই সমাবেশেও তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়া হয়। এরপর ১৯৯৬ সাল। সেদিন ছিল ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের স্মারক বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সভামঞ্চ লক্ষ্য করে একটি মাইক্রোবাস থেকে গুলি চালানো হয়।

বাংলাদেশে আগস্ট মাসটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৫ সালের মধ্য আগস্টে সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অন্যদিকে বিগত জোট সরকারের আমলে, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জঙ্গিরা তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছিল একযোগে ৬৩ জেলায় পাঁচ শতাধিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে।
অপশাসন কী, অপশাসনের ফল কী হতে পারে, বাংলাদেশের মানুষ তা প্রত্যক্ষ করেছে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। বর্তমানে আবার প্রত্যক্ষ করছে। কোনো আইন নাই, কানুন নাই। যাকে খুশি মিথ্যা মামলায় জেলে পুড়ে দেওয়া হচ্ছে। মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে-কুপিয়ে মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছে। বাড়িঘরে হামলা হচ্ছে। হত্যা, জখম করা হচ্ছে। বিচারের নামে প্রহসন হচ্ছে নিন্ম আদালত থেকে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত।

২০০১ থেকে শুরু করে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জামায়াত-বিএনপির অপশাসনকালে বারবার প্রমাণিত হয়েছে মানবিক নয়, একটি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী কী করে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে নিষ্ঠুরতার চরমে পৌঁছাতেও দ্বিধা করে না। সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘুদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইদের নেতৃত্বাধীন জেএমবিকে দিয়ে রাজশাহীসহ পশ্চিমাঞ্চলে তান্ডব চালানো হয়েছে। রাজশাহী শহরে বাংলা ভাই পাঁচ সহস্রাধিক জঙ্গি নিয়ে ট্রাক মিছিল করে, আর প্রশাসন-পুলিশ তাকিয়ে দেখে। ওরা আওয়ামী লীগ নেতকর্মীদের মেরে উল্টো করে গাছে ঝুলিয়ে রেখেছে। পূর্নিমা, মহিমার মতো বহু কিশোরীকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। সংখ্যালঘুরা বাড়িঘর ছেড়ে ভাসমান জীবন যাপন করেছে। তার কোনো কিছুই কি ভুলে যাওয়ার মতো!

কেন বারবার এমন জঘন্য হত্যাচেষ্টা? কেন বারবার আওয়ামী লীগকে সমূলে ধ্বংস করার নিষ্ঠুরতম অপচেষ্টা। এর নাম কি গণতান্ত্রিক রাজনীতি। এসবই ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার উদগ্র বাসনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জনকে মুছে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা। আর সে কারণেই বারবার তাদের লক্ষ্য হয় বঙ্গবন্ধু, বাহাত্তরের সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্রের আদর্শ। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তাই বাঙালি জাতিকে একাত্তরের মতোই আবার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এবার তাদের বিষদাঁত চিরতরে ভেঙে দিতে হবে। সময় দ্রæত এগিয়ে আসছে। সবাইকে প্রস্তুত হতে হবে সময়কে কাজে লাগানোর জন্য।

লেখক : সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী⁩

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত