দুই বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ গুণ: ফুটে উঠেছে ইউনুস-তারেকের আসল রুপ

65

Published on সেপ্টেম্বর 6, 2026
  • Details Image

স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে ৫২ বছর ধরে ২৪ সালের জুন মাস শেষে এসে খেলাপি ঋণ জমেছিল ২ লক্ষ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ২৬ সালের জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৬ লক্ষ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মাত্র দুই বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় চার লক্ষ কোটি টাকা যা প্রায় ৩ গুণ। মাত্র দুই বছরে ৫২ বছরের তিন গুণ। ২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ হয়েছে মোট ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। বাংলাদেশ এখন খেলাপি ঋণে চাদ (৩১.৫১%), ইকুয়েটারিয়াল গিনি (৩০.০%), আলজেরিয়া (২০.০৫) এবং ঘানাকে (১৮.১১%) হারিয়ে বিশ্ব চ্যম্পিয়ান। এমন চ্যাম্পিয়নশিপ আমাদের নতুন নয়, বেগম খালেদা জিয়ার ২০০১-০৬ শাসনামলে বাংলাদেশ টানা চার বছর দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

২০০৮ সাল শেষে খেলাপি ঋণ ছিল মোট ঋণের ১০.৮ শতাংশ। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ভূমিধ্বস বিজয়ের মাধ্যমে ২০০৯ সালে রাষ্ট্রপরিচালনার দ্বায়িত্ব পেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি আবার সুশৃঙ্খল হতে শুরু করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের উপরে উঠে যায়। খেলাপি ঋণ ১১ সালে নেমে আসে ৬.১ শতাংশে। অর্থনীতি তখন এতটাই ভাল করছিল যে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের জন্য ধন্য ধন্য রব উঠে। জাতিসঙ্ঘ বলে “উন্নয়নের রোল মডেল”। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ঢাকায় এসে বলেন, “অসাধারণ উন্নয়নের গল্প”। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয় – ৭.৮৮ শতাংশ। ২০ সাল শেষে কু-ঋণ ছিল ৭.৭৪ শতাংশ। এরপর কোভিড অতিমারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রা ক্ষতিগ্রস্থ হলে ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা কমে যায় যার চিত্র ফুটে ওঠে কু-ঋণে। ২২ থেকে ২৪ সালের জুন সময়কালে ধীরে ধীরে কু-ঋণ বেড়ে ২৪ সালের জুন শেষে দাঁড়ায় ১২.৫৬ শতাংশে। আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক ঋণ ৭.৫ গুণ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.৯৬ গুণ বড় হলেও গড় কু-ঋণ ছিল মাত্র ৯.০৮ শতাংশ। ইউনুস এবং তারেক জমানায় যা লাফ ফিয়ে ৩২.২৬ শতাংশে উঠে গেছে।

২৪ সালের আগস্ট মাসে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত এবং জঙ্গি উত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে। সে বছর জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে খেলাপি ঋণ ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি পায়। এরপর নভেম্বর মাসে ঋণ শ্রেনিবিন্যাস করার নিয়ম বদল করে খেলাপি ঋণ নির্ধারনের সময়কাল ১৮০ দিন থেকে কমিয়ে ৯০ দিন করা হয়। এর ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে পারে। ২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়কালে নতুন খেলাপি ঋণ হয়েছে ৬০ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। ২৫ সাল এবং ২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লক্ষ ৬১ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার জন্য ২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এবং চলতি বছরের মে মাসে খেলাপি ঋণের মাত্র ২ শতাংশ জমা দিয়ে ঋণ পুনঃতফশিল করা এবং জুলাই মাসে সুদ মাফ করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোন উদ্যোগই কাজ করেনি। পকেটে পয়সা না থাকলে নীতি সুবিধা কাজে লাগানো যায় না। খেলাপি ঋণ কমেনি, অনেক বেড়েছে।

২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়কালে বৃদ্ধি পাওয়া প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে একটা অংশ খেলাপি হয়েছে শ্রেনিবিন্যাস করার নিয়ম বদলের কারণে আরেক অংশ ঋণের টাকা ফেরত দিতে না পারার কারণে। কোন কারণে কত হয়ছে তা কেন্দ্রীয় ব্যংকের পক্ষ থেকে জনগণকে জানানো হয়নি। জুলাই-সেপ্টেম্বরের ৭৪ হাজার কোটি এবং নতুন নিয়মসহ অক্টোবর-ডিসেম্বরের ৬১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি তুলনা করলে বোঝা যায় বিগত দুই বছরে যে ৪ লক্ষ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে তার খুব সামান্য একটা অংশ বেড়েছে ঋণ শেণিবিন্যাস করার নিয়ম বদলের কারণে। অবস্থা দৃষ্টে ধরে নেয়া যায় যে এর পরিমাণ কোনভাবেই ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে না।

ডঃ ইউনুস এবং তারেক রহমানের পরপর দুই সরকারের সময়ে খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ হিসেবে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দ্যা বিজনেস স্টান্ডার্ডকে দেয়া এক পডকাস্টে বলেছেন, আগে ঋণের আসল চেহারা চাপা দিয়ে রাখার জন্য তা বোঝা যেত না। চাপা দিয়ে রাখা বলতে কি বুঝিয়েছেন তা তিনি খোলাসা করেননি। তিনি ঋণ অবলোপন করা কথা বুঝিয়ে থাকতে পারেন। এছাড়া আর কোন উপায়ে খেলাপি ঋণ চাপা দেয়া যায়? ঋণ অবলোপন ব্যাংকিং জগতের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। পৃথিবীর সকল দেশেই ব্যবসায়ে ক্ষতি বা অন্য কোন কোন কারণে ঋণ পরিশোধে অপারগ ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের ঋণ অবলোপন করে থাকে।

ডঃ ইউনুসের সরকারের সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক কত টাকা ঋণ অবলোপন করেছে তা জানিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দৈনিক যুগান্তরে ২৭ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৪টি ব্যাংক ২১ বছরে ৮১ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে। তবে এই অবলোপিত ৮১ হাজার কোটি টাকা বর্তমান খেলাপি ঋণের ৬ লক্ষ কোটি টাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত কি-না তা কোন মাধ্যমেই জানা যায় না। এই ২১ বছরের মধ্যে ১/১১ সরকারের ২ বছর এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সাড়ে ৩ বছর সময়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২১ বছরে গড়ে প্রতি বছর ৩.৮৫ হাজার কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে। গড় হিসেবে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে অবলোপন হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকার সম পরিমাণ ঋণ। ২৪ সালের জুন থেকে ২৬ সালের জুন পর্যন্ত যে ৪ লক্ষ কোটি টাকা নতুন খেলাপি হয়েছে তার মধ্যে অবলোপিত ঋণ আছে কি-না তা আমরা জানি না। অবলুপ্ত ঋণ আবার খেলাপি ঋণ হিসেবে ব্যাংকগুলোর হিসেবে খাতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এমন কোণ খবর আমরা গণমাধ্যমে পাইনি। তবুও যুক্তির জন্য যদি ধরেও নেই যে তা অন্তর্ভুক্ত আছে তবে বেড়ে যাওয়া ৪ লক্ষ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ থেকে তা এবং ঋণ শেণিবিন্যাস করার নিয়ম বদলের কারণে ১০ হাজার কোটি টাকা বাদ দিলে ইউনুস-তারেক শাসনামলে নীট খেলাপি বেড়েছে ৩ লক্ষ ২৬ হাজার কোটি টাকা। সংখ্যাটা অনেক বড়।

বস্তুত বিপুল পরিমাণে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালিত মব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি। মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে ইউনুস সরকার ভিন্ন মতের রাজনীতিক এবং ব্যবসায়ীদের ঘর-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে; রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে ব্যবসায়ীদের উপর জুলুম ও চাঁদাবাজি চালিয়েছে যা বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়েও একই গতি এবং মাত্রায় চালু রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের প্রাণের রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে চিরতরে রাজনীতির মাঠ থেকে নিশ্চিহ্ন করতে গিয়ে ডঃ ইউনুস এবং তার ধারাবাহিকতায় তারেক রহমান সরকার যে নৈরাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে তার প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন মাত্র ২.২ শতাংশ। করোনা অতিমারির সময় যখন সারা দুনিয়া কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে ঘরে ঢুকে গিয়েছিল সেই অসম্ভব সময়েও জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ৩.৪৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ছিল। তাঁর সরকার পরিচালনার সময়ে অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি হয়ে ছিল ৬.৮ শতাংশ।

শুধু অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিই নয়, বাংলাদেশ অর্থনীতির প্রতিটি সূচক এখন ইতিহাসের নিম্নতম পর্যায়ে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি, কাঁচামাল ও মূলধনী পণ্যের আমদানি, রফতানি, শিল্প উৎপাদন – সবকিছু কমে গেছে। পাওয়া যাচ্ছে না বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সার। কমে গেছে কৃষিকাজ, বন্ধ হয়ে গেছে শত শত কারখানা, ধুঁকে ধুঁকে চলছে হাজার হাজার। ভিন্ন রাজনৈতিক মতের অনুসারী বলে আগুন লাগিয়ে এবং গায়ের জোরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে অনেক বৃহৎ শিল্প গ্রুপ। বেকার হয়ে গেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। বিশ্ব ব্যাংক গত নভেম্বরে বলছে, দারিদ্র্য ঝুঁকিতে রয়েছে সোয়া ছয় কোটি মানুষ। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ “ঋণাত্বক” বলে ঘোষণা করেছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হবার আরেক প্রমাণ – বেড়ে যাওয়া সরকারের ঋণ। ২৬ সালের মে থেকে আগস্ট – মাত্র তিন মাসের মধ্যে সরকার ১ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থনীতির দুর্দশার কারণে জনগণের আয় নেই বলে সরকার রাজস্ব আদায় করতে পারছে না – ঋণ করে চলছে। এমন চরম অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় করে বোয়িং বিমান কিনছে তারেক রহমান সরকার। অর্থনীতি খারাপ বলে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, ব্যবসায়ীরা আয় করতে পারছেন না, ঋণের কিস্তি শোধ করতে পারছেন না – বাড়ছে খেলাপি ঋণ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে, চাঁদাবাজি, লুটপাট বন্ধ করে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত খেলাপি ঋণ কমে আসার সুযোগ নেই।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত