পাকিস্তান সরকারের স্বরূপ উন্মোচনে শেখ মুজিব সিদ্ধহস্ত ছিলেন

1045

Published on অক্টোবর 14, 2020
  • Details Image

ড. আতিউর রহমান:

১৯৫৬ সালের ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত কাগমারী সম্মেলনে দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান কৃষকসমাজের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য সংঘবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানান। গোয়েন্দা বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, তিনি এদিন নানা সমালোচনায় শাসকগোষ্ঠীর স্বরূপ উদ্ঘাটন করেন। তিনি বলেন, ‘দেশ ও জাতির শত্রু এই শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে হবে। যে বাংলা একদিন শস্য-শ্যামলা ছিল, আজ সেই বাংলা শুষ্ক মরুভূমি। একমুঠো ভাতের জন্য মানুষ কুকুরের মতো রাস্তায় ঘুরছে।

২০৯ নম্বর প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, শেখ মুজিব বলেন- ‘শাসকগোষ্ঠীর কবল হইতে আত্মরক্ষা করিয়া যদি আমাগিদকে মানুষের মর্যাদা লইয়া বাঁচিতে হয়, তবে জাতির মহাসনদ ২১ দফার বাস্তব রূপায়ণ অপরিহার্য। যাহারা ২১ দফার কার্যসূচিকে কার্যে পরিণত করিবার ওয়াদা করিয়াছিলেন, তাহারা আজ জালিম মুসলিম লীগের সহিত হাত মিলাইয়া ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রহিয়াছেন। এই শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করিতে না পারিলে দেশবাসীর সম্মুখে সমূহ বিপদ রহিয়াছে’ (গোয়েন্দা প্রতিবেদন, চতুর্থ খ-, পৃষ্ঠা-৪৮৫)। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ আগস্ট তিনি প্রতিবাদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ২২ আগস্ট দৈনিক মিল্লাত ও ২৩ আগস্ট দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত ওই বিবৃতি সংরক্ষণ করে গোয়েন্দা বিভাগ।

ওই বিবৃতি থেকে জানা গেছে, শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন- ‘আমি আমার দেশবাসী ভাইদের নিকট বিশেষ জোরের সহিত বলিতে চাই যে, ২৭ আগস্ট তারিখে প্রতিবাদ দিবসে সাধারণ ধর্মঘট অনুষ্ঠান, জনসভা, শোভাযাত্রা প্রভৃতি অনুষ্ঠানের জন্য আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে তাহা বলবৎ রহিয়াছে। অতীতে আমরা শাসকচক্রের অনেক অগণতান্ত্রিক ও অগঠনতান্ত্রিক কার্য প্রতিরোধ করিয়াছি এবং ভবিষ্যতেও আমরা ইহা করিব’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৪৯০)।

১৯৫৭ সালের খুব অল্প প্রতিবেদনই সংরক্ষণ করে গোয়েন্দা বিভাগ কিংবা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় খুব বেশি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। ১৯৫৭ সালের ৫ নভেম্বর শেখ মুজিবুর রহমান একটি সংবাদ বিবৃতি প্রকাশ করেন। ওই বিবৃতিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ বিবৃতিটি সংরক্ষণ করে গোয়েন্দা বিভাগ। ওই বিবৃতির মধ্যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ১০ বছরের শাসনব্যবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পায়ন প্রতিষ্ঠার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের চরম অনীহার কথা উল্লেখ করে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘একটি ক্ষুদ্র কোটারি গঠনের উদ্দেশ্যে গত দশ বৎসর যাবৎ গোটা দেশ এবং বিশেষভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে যেরূপ অধঃপতনের মুখে ঠেলিয়া দেওয়া হইতেছে বর্তমানে প্রচেষ্টা উহারই পুনরাবৃত্তি এবং ইহা অতীতের সবকিছুকেই ছাপায়া গিয়াছে। বছরের পর বছর পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি যে বিমাতাসুলভ ব্যবহার প্রদর্শিত হইয়াছে তাহার ফলে পূর্ব পাকিস্তান বলা বাহুল্য ভঙ্গুর হইয়া পড়িয়াছে। এই দুঃখজনক কাহিনি আজ সর্বজনবিদিত। সকল রাজনৈতিক দলের বিশিষ্ট নেতৃবর্গ এমনকি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোটারির মুখপাত্রগণ পর্যন্ত প্রকাশ্য বক্তৃতা-বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তানে এ দুঃসহ অবস্থার সত্যতা স্বীকার করিয়াছেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্প এবং অন্যান্য উন্নয়ন ক্ষেত্রে যে অসম অবস্থা বিদ্যমান রহিয়াছে, প্ল্যানিং বোর্ড উহা স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমস্যা এবং পাকিস্তানের উভয় অংশের এই অসম অবস্থার প্রতিবিধানের জন্য প্ল্যানিং বোর্ড উপযুক্ত পরামর্শ দান অথবা পথ বাতলাইতে অসমর্থের পরিচয় দিয়াছেন।’

‘শাসনতন্ত্রের বিধানে পরিষ্কারভাবে প্রদেশের হাতে স্ব-স্ব শিল্প গঠনের ভার দেওয়ার নির্দেশ থাকিলেও কেন্দ্র আওয়ামী লীগ দল ক্ষমতায় আসিয়া এই বিষয়ে কেন্দ্র ও প্রদেশের অধিকারের সীমানা নির্ধারণ না করা পর্যন্ত এই অশুভ চক্রটি শাসনতন্ত্রে এই বিলটা কার্যকরকরণ বিলম্বিত করে। পূর্ব পাকিস্তানে বেশি পরিমাণে শিল্প প্রতিষ্ঠা করিয়া দেশের উভয় অংশের শিল্পায়নে সমতা আনার জন্য ক্রমে ক্রমে এই অসমতা দূর করার সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।’

‘নিজেদের ঘৃণ্য ব্যবহারের সাফাই দেওয়ার জন্য এবং এই প্রদেশের শিল্পায়ন ব্যাহত করিবার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার সব সময়ই বৈদেশিক মুদ্রার অভাবের অজুহাত দেখাইয়াছেন। আইসিএ বেসরকারি শিল্প উন্নয়নে ৫ কোটি টাকার মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা সাহায্য করিবেন জানিতে পারিয়া সাধারণ মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়। স্বাভাবিকভাবেই সকলে আশা করেন যে, এই টাকার অধিকাংশই পূর্ব-পাকিস্তানের শিল্প উন্নয়নে ব্যয়িত হইবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় করাচির চক্র দীর্ঘকাল ধরিয়া আইসিএ-এর এই প্রস্তাব জনসাধারণের প্রতিনিধির এমনকি মন্ত্রীদের নিকট হতেও গোপন করে (পৃষ্ঠা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে কিছু বাক্য মূল প্রতিবেদন থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি) দেশের প্রয়োজন এবং আর্থিক সঙ্গতির প্রতি লক্ষ্য করিয়া পরিকল্পনাগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয় এবং পরীক্ষান্তে উহা গ্রহণ করা হয়। কোনো অঞ্চলের অধিবাসী কিংবা তাহার রাজনৈতিক মতবাদ কি সে সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন না তুলিয়া প্রার্থীও আর্থিক সচ্ছলতার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া প্রার্থীর মনোনীত করা হয়।’

ফলে বহু মুসলিম লীগার এই অ্যালটমেন্ট লাভ করে। রাজনৈতিক মতবাদ কখনো বিচার করা হয় নাই। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার অতীতের কুখ্যাত মুসলিম লীগেরই ধ্বংসাবশেষ। গত ১৯৫৪ হইতে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান কর্তৃক যখন জোর প্রতিবাদ উত্থাপিত হইতে থাকে তখন মুসলিম লীগ অধ্যুষিত কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম পাকিস্তানের ১৫০টি শিল্প ইউনিটের জন্য ৩৫ কোটি টাকা এবং সে স্থলে পূর্ব পাকিস্তানকে উপেক্ষা করিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে বৃহদাকার শিল্প ছাড়াও হাজার হাজার ক্ষুদ্রকার শিল্প গড়িয়া তোলার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদর্শিত হইয়াছে।’

...

‘আজাদী লাভের পর হইতে লোকচক্ষুর আড়ালে দেশের অর্থনীতির প্রতি লক্ষ না রাখিয়া গোপনে অনুগ্রহ বিতরণের যে রেওয়াজ চলিয়া আসিতেছিল তাহা ভঙ্গ করিয়া প্রাদেশিক সরকার বিভিন্ন প্রকার ৩৩ ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য শিল্পপতিদের নিকট হইতে প্রকাশ্যভাবে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। এই শিল্প প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষা কিংবা অর্জনের ওপরও দেশীয় কাঁচামালের ভিত্তিতে স্থাপিত শিল্প প্রতিষ্ঠানের ওপর অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমি যে কোনো ব্যক্তিকে এই প্রদেশ হইতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত লোকদের নামের তালিকা পরীক্ষার চ্যালেঞ্জ দিতেছি। আমি দৃঢ়তার সহিত বলতে পারি যে তালিকায় দেখা যাইবে যে গোড়া মুসলিম লীগপন্থীরাও অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ হইতে বঞ্চিত হন নাই’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৫১৭)।

শেখ মুজিব বলেন, ‘স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী ১০ বৎসর পূর্ব পাকিস্তানিদের অনশন-অর্ধাহারে জর্জরিত করা হইয়াছে এবং এই অংশের কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই বিবেচনা করা হয় নাই। কেন্দ্রের বর্তমান চক্র ক্ষমতাসীন হইয়াই প্রাদেশিক সরকারকে তাহাদের সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থগিত রাখিবার নির্দেশ দান করেন। কেন্দ্রীয় সরকার বর্তমান বৎসর পূর্ববঙ্গকে কোনো উন্নয়ন ঋণদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিয়াছে। ইহা পূর্ব পাকিস্তানের অস্তিত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জবিশেষ। কেন্দ্রের এই অস্বীকৃতির ফলে প্রদেশে খাদ্য ঘাটতি। জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্য এবং প্রদেশে বিদ্যুৎশক্তির অভাব চিরস্থায়ী হইবে। ইহার ফলে পূর্ব পাকিস্তানিদের স্থায়ীভাবে করাচি চক্রের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হইয়া থাকিতে হইবে। এই দেশের উপর অর্থনৈতিক শোষণকে নিশ্চিতকরণ এবং নিজ পুরাতন সমর্থকদের তাহাদের পুরাতন আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারকে বিশ্বের সম্মুখে দেশকে হেয় করিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হয় নাই এবং তাহারা বর্তমানে সাহায্যপ্রাপ্তি অর্থকে বাজেয়াপ্ত হইয়া যাইতে দেওয়ার কথা বিবেচনা করিতেছে। পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের ব্যাপক সংস্কার আশু প্রয়োজন। পাকিস্তান রেলওয়ের উন্নয়নের জন্য প্রাপ্ত মোট ১৫ কোটি টাকা খরচের মধ্যে পূর্ববঙ্গ রেলওয়ের জন্য মাত্র ১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হইয়াছে। দেশের ভাগ্যনিয়ন্তা ভদ্রলোকগণ এই অসম বিতরণ ব্যবস্থার কৈফিয়ত দান করিবেন?’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৫১৮)।

এই দীর্ঘ বিবৃতির মাধ্যমে শেখ মুজিব ওই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের প্রাপ্য অথনৈতিক হিস্যা থেকে কীভাবে বঞ্চিত করেছে, এর তথ্যভিত্তিক বিবরণ তুলে ধরেছেন। তিনি যে সময়টায় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন, ওই সময় দলমত নির্বিশেষে পূর্ব পাকিস্তানের উদ্যোক্তাদের জন্য সব ব্যবস্থা নিয়েছিলেন- এসবেরও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তাদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য আর্থিক সহায়তার সুযোগ বন্ধ করে দেয়। এর পরিণতিতে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর খাদ্য সংকট বেড়ে যায়। তাদের শিল্পোন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের আকাক্সক্ষাও পূরণ হতে পারেনি। এজন্য তিনি একচোখা পাকিস্তানি শাসকচক্রকে দায়ী করেন। এভাবেই তার মনে ধীরে ধীরে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ধারণা বলিষ্ঠ হতে থাকে।

 

লেখকঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত