1012
Published on জুন 26, 2026বর্তমানে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সন্ত্রাসী হামলার পর দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। ছাত্র, শ্রমিক, গণমাধ্যমকর্মীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণে যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছিল, তার প্রায় দুই বছর পর এসে এখন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ডালপালা মেলছে। জনমনে প্রশ্ন উঠছে—আওয়ামী লীগ পরবর্তী বাংলাদেশ আসলে কোন দিকে যাচ্ছে?
আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম বড় শক্তি ছিল গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহীত বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। ‘একটি বাড়ি একটি খামার’, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং বিনামূল্যে বই বিতরণের মতো উদ্যোগগুলো সরাসরি তৃণমূলের মানুষকে উপকৃত করত।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান সরকার এই তালিকাগুলো ‘পুনর্মূল্যায়ন’ বা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এই সংস্কার প্রক্রিয়ার কারণে বহু প্রকৃত সুবিধাভোগী, বিশেষ করে গ্রামীণ বিধবা ও বৃদ্ধারা তাদের নিয়মিত ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সমালোচকদের মতে, সংস্কারের নামে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং নতুন সুবিধাভোগী তালিকাভুক্তির মাধ্যমে এক ধরনের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চলছে, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ফেলেছে।
বিগত সরকারের আমলে দেশের শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গন এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সুবিধা ভোগ করেছে। তৎকালীন আন্দোলনের সময় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একটি বড় অংশ পরিবর্তনের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছিল।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক ধরনের স্থবিরতা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিভিন্ন স্থানে শুটিং বন্ধ হওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা, নাটক ও গানের বিষয়বস্তু নিয়ে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর ফতোয়া এবং সেন্সরশিপের মতো ঘটনা দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক কাঠামোর অনুপস্থিতিতে মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটছে, যা মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথকে রুদ্ধ করছে।
কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদকে স্নাতকোত্তরের (মাস্টার্স) সমমান দেওয়ার সিদ্ধান্তটি শেখ হাসিনা সরকারের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত পদক্ষেপ ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ৩০ লক্ষাধিক কওমি শিক্ষার্থীকে আইটি ট্রেনিং ও মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করার লক্ষ্যেই ভোটের হিসাব না করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে এই রাজনৈতিক বিনিয়োগের সুফল তৎকালীন সরকার পায়নি; বরং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে এই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ সম্মুখভাগে থেকে সরকারের পতনে ভূমিকা রাখে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি দূরদর্শিতা নাকি রাজনৈতিক ভুল কৌশল ছিল—তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে নারী ক্ষমতায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছিল। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের মালিকানা নারীর নামে দেওয়া, মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মতো উদ্যোগগুলো সামাজিক ভারসাম্য এনেছিল।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের কিছু কিছু এলাকায় নারীদের পোশাক পরিচ্ছদ, সহশিক্ষা (কো-এডুকেশন) এবং নারীদের অবাধ চলাচলের ওপর অনানুষ্ঠানিক বিধিনিষেধ ও ফতোয়া জারির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ নারী অধিকারের দিক থেকে আফগানিস্তানের মতো রক্ষণশীল মডেলের দিকে ধাবিত হতে পারে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পর দেশজুড়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। যার ফলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেশের মানুষ বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনে। বর্তমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে প্রতিটি ঘটনা নথিবদ্ধ থাকায় ইতিহাস আড়াল করার সুযোগ কম।
বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে বাংলাদেশের সামনে প্রধানত তিনটি ভবিষ্যৎ পথ দৃশ্যমান হয়:
যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে জনগণের ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। কিন্তু পরিবর্তনের পর যদি সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা, নিরাপত্তা, শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক ভাতা নিশ্চিত না হয়, তবে সেই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নের মুখে পড়ে। একটি দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। বাংলাদেশ এখন সেই রূপান্তরের কঠিন সময় পার করছে। ইতিহাসই নির্ধারণ করবে—আওয়ামী লীগ বিহীন এই বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেশের জনগণকে কোন দিকে নিয়ে যায়।
লেখক: মফিজুল ইসলাম, গণমাধ্যমকর্মী