871
Published on আগস্ট 6, 2026বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এক মহিয়সী নারীর নাম। তাঁর ডাক নাম রেণু। বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই রেণুর নাম। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিনী। এটি তাঁর একটি পরিচয়। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একজন সহযোদ্ধা। জেল, হুলিয়া বা অন্যান্য কারণে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি হয়ে উঠতেন দলীয় নেতাকর্মীদের ভরসা এবং পরামর্শদাতা। বিপদে-আপদে সাহস জুগিয়ে, পরামর্শ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবনেও তিনি হয়েছিলেন প্রেরণার উৎস। সর্ব অর্থেই তিনি ছিলেন এক অসামান্য নারী।
প্রায় শৈশবেই রেণু বঙ্গবন্ধুর জীবন চলার সঙ্গী হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিল তিল করে তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন। তাই সংসারের চাকা ঘুরানোর সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত সফলভাবে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনেরও সঙ্গী হতে পেরেছিলেন তিনি। কেমন করে পারলেন রেণু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতো একজন বহির্মুখী, বহুবার কারাবরণকারী রাজনীতিবিদের সংসার সামলে নিতে? জাতির পিতার বিপদে-আপদে, জেলজীবনে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি সাহস জুগিয়েছেন, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। দৈহিক উচ্চতায় ছোটখাটো এ মানুষটি ছিলেন ভীষণ রকম দৃঢ়চেতা ও আত্মপ্রত্যয়ী। জীবন ও রাজনীতিকে উপলব্ধির পাঠ ও শিক্ষা তিনি কি নিজের জীবন থেকেই নিয়েছিলেন?
বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন একজন দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী এবং দেশপ্রেমিক বীর নারীযোদ্ধা। বাঙালির মুক্তির আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে প্রেরণা দিয়েছেন নিজের আত্মজীবনী লেখার জন্য। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে সেসব কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ওরফে রেণু প্রসঙ্গ। মহীয়সী এই নারীর আত্মত্যাগ শুধু ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর প্রতি নয়, দেশের প্রতিও। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখছেন, “আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, ‘বসেই তো আছ, লেখো তোমার জীবনের কাহিনি।’
বললাম, ‘লিখতে যে পারি না, আর এমনকি করেছি যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলো জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।’
...হঠাৎ মনে হলো লিখতে ভালো না পারলেও ঘটনা যতদূর মনে আছে লিখে রাখতে আপত্তি কী? সময় তো কিছু কাটবে।... আমার স্ত্রী, যার ডাকনাম রেণু- আমাকে কয়েকটা খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছে। রেণু আরও এক দিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।
...রেণু খুব কষ্ট করত, কিন্তু কিছুই বলত না। নিজে কষ্ট করে আমার জন্য টাকা-পয়সা জোগাড় করে রাখত, যাতে আমার কষ্ট না হয়।”
বায়ান্নর উত্তাল দিনগুলোতে কারাগারে দীর্ঘ অনশনের কারণে বঙ্গবন্ধুর শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। এই অবস্থায় মুক্তি দিলে তাঁকে গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। সেই স্মৃতিচারণা : “পাঁচ দিন পর বাড়ি পৌঁছালাম। মাকে তো বোঝানো কষ্টকর। হাচু আমার গলা ধরে প্রথমেই বলল, ‘আব্বা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই। ‘একুশে ফেব্রুয়ারি ওরা ঢাকায় ছিল, যা শুনেছে, তাই বলে চলেছে। কামাল আমার কাছে আসল না, তবে আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি খুব দুর্বল, বিছানায় শুয়ে পড়লাম। গতকাল রেণু ও মা ঢাকা থেকে বাড়ি এসে আমার প্রতীক্ষায় দিন কাটাচ্ছিল। এক এক করে সকলে যখন আমার কামরা থেকে বিদায় নিল, তখন রেণু কেঁদে ফেলল এবং বলল, ‘তোমার চিঠি পেয়ে আমি বুঝেছিলাম, তুমি কিছু একটা করে ফেলবা। আমি তোমাকে দেখবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কাকে বলব নিয়ে যেতে, আব্বাকে বলতে পারি না লজ্জায়। নাসের ভাই বাড়ি নেই। যখন খবর পেলাম খবরের কাগজে, তখন লজ্জা-শরম ত্যাগ করে আব্বাকে বললাম। আব্বা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাই রওনা করলাম ঢাকায়, সোজা আমাদের বড় নৌকায় তিনজন মাল্লা নিয়ে। কেন তুমি অনশন করতে গিয়েছিলে? এদের কি দয়ামায়া আছে? আমাদের কারও কথাও তোমার মনে ছিল না? কিছু একটা হলে কি উপায় হতো? আমি এই দুইটা দুধের বাচ্চা নিয়ে কী করে বাঁচতাম? হাচিনা, কামালের অবস্থা কী হতো? তুমি বলবা, খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট তো হতো না? মানুষ কি শুধু খাওয়া-পরা নিয়েই বেঁচে থাকতে চায়? আর মরে গেলে দেশের কাজই বা কীভাবে করতা?’ আমি তাকে কিছুই বললাম না। তাকে বলতে দিলাম, কারণ মনের কথা প্রকাশ করতে পারলে ব্যথাটা কিছু কমে যায়। রেণু খুব চাপা, আজ যেন কথার বাঁধ ভেঙে গেছে। শুধু বললাম, ‘উপায় ছিল না।’ বাচ্চা দুইটা ঘুমিয়ে পড়েছে। শুয়ে পড়লাম...”
ভোগবাদিতার মোহ ছিল না বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের। অতি সাধারণভাবে জীবন চালিয়েছেন। এটাই ছিল তাঁর যাপিত জীবনের দর্শন। এই শিক্ষা তিনি দিয়েছিলেন তাঁর সন্তানদেরও। এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের মানুষ ছিলেন তিনি। নিজস্ব সচেতনতা বোধ ও চিন্তাচেতনায় তাঁর সময়কে তিনি যেভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, তা নিঃসন্দেহে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ভিন্ন মাত্রা লাভ করে।
জেল-জুলুম-হুলিয়া মাথায় নিয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নভাবেই চলেছে বঙ্গবন্ধুর জীবন। বেগম ফজিলাতুন্নেছা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘রেণু আমার পাশে না থাকলে এবং আমার সব দুঃখকষ্ট, অভাব-অনটন, বারবার কারাবরণ, ছেলেমেয়ে নিয়ে অনিশ্চিত জীবনযাপন হাসিমুখে মেনে নিতে না পারলে আমি আজ বঙ্গবন্ধু হতে পারতাম না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও যুক্ত থাকতে পারতাম না। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় সে আদালতে নিত্য হাজিরা দিয়েছে এবং শুধু আমাকে নয়, মামলায় অভিযুক্ত সবাইকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে। আমি জেলে থাকলে নেপথ্যে থেকে আওয়ামী লীগের হালও ধরেছে।’
বঙ্গবন্ধু আরও লিখেছেন, ‘...সামনে আমি এগিয়ে গেলেও কোনো দিন আমার স্ত্রী বাধা দেয়নি। এমনো দেখেছি যে, অনেক বার, আমার জীবনের ১০-১১ বছর আমি জেল খেটেছি। জীবনে কোনো দিন মুখ কালা কিংবা আমার ওপর প্রতিবাদ করেনি। তাহলে বোধহয় জীবনে অনেক বাধা আমার আসত। এমন সময় আমি দেখেছি যে, আমি যখন জেলে চলে গেছি, আমি একআনা পয়সাও দিয়ে যেতে পারিনি আমার ছেলেমেয়ের কাছে। আমার সংগ্রামে তাঁর দান যথেষ্ট রয়েছে।’
বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে তাঁর মাকে নিয়ে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে তিনি তাঁর মাকে যেন নয়, এক সর্বংসহা মহীয়সী নারীকে তুলে ধরেন। ওই বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘একটার পর একটা ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে। কিন্তু একটা জিনিস আমি বলব যে, আমার মাকে আমি কখনো ভেঙে পড়তে দেখিনি। যত কষ্টই হোক আমার বাবাকে কখনো বলেননি যে, তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও বা চলে আস বা সংসার কর বা সংসারের খরচ দাও। কখনো না।’
লন্ডনপ্রবাসী সাংবাদিক সাহিত্যিক আবদুল গাফফার চৌধুরী তার একটি নিবন্ধে উলে¬খ করেন, ‘...জাতির সাহসী ও মমতাময়ী জননী হয়ে সেই রক্তের সঙ্গে নিজের রক্ত মিশিয়েছেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। কৃতজ্ঞ জাতির কাছে তিনি তাই বঙ্গমাতা।... এই মহীয়সী নারীর জীবন পরম গৌরবের। একদিকে তিনি জাতির পিতার পত্নী, শহীদ সন্তানদের জননী এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একজন শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেত্রী শেখ হাসিনারও জন্মদাত্রী।’
মহিয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের জন্ম ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকদের বুলেটে স্বামী-সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিভে গিয়েছিল তাঁরও প্রাণ-প্রদীপ। কিন্তু মাত্র ৪৫ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি বাঙালি জাতিকে যা দিয়েছেন, তার তুলনা নাই। স্বামীর পাশে থেকে কিংবা স্বামীর অবর্তমানে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে পরম মমতায় গন্তব্যে নিয়ে গেছেন। তাই আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে তাঁর অধিষ্ঠান। বঙ্গমাতা হিসেবে মানুষ তাঁকে স্মরণ করে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়।
আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বাংলাদেশের হৃদয়ে আজ রক্তক্ষরণ হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসররা আজ নেকড়ে-হায়েনার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, হামলা করছে, রক্ত ঝরাচ্ছে, বঙ্গসন্তানদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। এই সময়ে একজন বঙ্গমাতার অভাব আমরা বড় বেশি অনুভব করছি। মাথার ওপর তাঁর স্নেহমাখা হাতের অভাব বোধ করছি। তাঁর আদর্শ, তার ত্যাগ, ঘাতকের বুলেটে ঝরা তাঁর প্রতিটি রক্তবিন্দু হোক আমাদের সাহস, প্রেরণা ও চলার পথের পাথেয়।
লেখক: এম নজরুল ইসলাম, সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক।