বঙ্গমাতা থেকে জননেত্রী: এক অমর সংগ্রামী উত্তরাধিকার

566

Published on আগস্ট 7, 2026
  • Details Image

​বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রাম, স্বাধিকার আন্দোলন এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস এক অবিচ্ছেদ্য মহাকাব্য। এই মহাকাব্যের নেপথ্যে পুরুষ নেতৃত্বের পাশাপাশি যে নারীর ধমনীতে প্রবাহিত হয়েছে অসীম সাহস, ধৈর্য, ত্যাগ আর দূরদর্শিতা, তিনি হলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে জন্ম নেওয়া এই মহীয়সী নারী শৈশবেই পিতা শেখ জহুরুল হক ও মাতা হোসনে আরা বেগমকে হারিয়েছিলেন। বাবা-মা হারানোর সেই বেদনাবিধুর সময়ে তিনি প্রথমে তাঁর দাদা -দাদীর কাছে ও পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর মায়ের কাছে পরম মমতায় লালিত-পালিত ও বড় হয়ে ওঠেন। স্নেহের আতিশয্যে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল 'রেনু'। পরবর্তীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে জীবনবতী হয়ে তিনি ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়ে পরিণত হন।

​বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে ছায়াসঙ্গীর মতো পাশে ছিলেন বঙ্গমাতা। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬ দফা আন্দোলন এবং ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের নেপথ্যেও ছিল তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও সঠিক দিকনির্দেশনা। স্বামীর দীর্ঘ কারাবন্দী দশায় অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা, আইনি লড়াইয়ের ব্যবস্থা করা এবং সংসার ও সন্তানদের আগলে রাখার অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তিনি।

​১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবরুদ্ধ ঢাকায় চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেও তিনি বাঙালির মুক্তির পক্ষে অটল মনোবল বজায় রেখেছিলেন। শুধু রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবেই নয়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বন্দিদশা থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহস জুগিয়েছেন। দেশ স্বাধীনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বঙ্গমাতার অবদান ছিল অপরিসীম। তিনি বিশেষভাবে নজর দিয়েছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বারা নির্যাতিত মা-বোনদের সামাজিক মর্যাদা ও পুনর্বাসনের দিকে। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমন অনেক পরিবারকে খুঁজে বের করেছিলেন যাদের সহায় সম্বল বলতে কিছুই ছিল না। নির্যাতিত নারীদের সামাজিকভাবে সম্মানজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে তিনি যে অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা আজকের প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।

​১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করা এই মহীয়সী নারীর জীবনপ্রদীপ নিভে যায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে। আগস্ট মাসেই তাঁর জন্ম এবং এই আগস্ট মাসেই ঘাতকদের নির্মম বুলেটে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে সপরিবারে শহীদ হন তিনি। মাত্র ৪৫ বছরের জীবনে তাঁর আত্মত্যাগ ও আদর্শ চিরঅম্লান হয়ে রয়েছে বাঙালির হৃদয়ে।

​মায়ের সেই আপসহীন লড়াই, সুমহান আদর্শ এবং ত্যাগের রক্তপ্রবাহ আজ সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বঙ্গমাতার জ্যেষ্ঠ কন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনার মাঝে। মায়ের শেখানো সেই মানবিক মূল্যবোধ ও দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দীক্ষা আজ রাষ্ট্রীয় পরিসরে বিস্তৃত। জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে বঙ্গমাতার সেই মানবিক গুণাবলিকে রাষ্ট্রীয় দর্শনের মূলে নিয়ে এসেছিলেন। মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, স্বামী নিগৃহীতা নারী ভাতা, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর প্রদান, এবং দুস্থদের খাদ্য সহায়তার মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছিলেন। বঙ্গমাতা যেমন ব্যক্তিগতভাবে মানুষের দুঃখ মোচনে সচেষ্ট ছিলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই দর্শনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। আজ প্রান্তিক জনপদ থেকে শুরু করে অসহায় প্রতিটি মানুষ তাঁর মাঝে খুঁজে পায় মায়ের মমতা ও আস্থার ঠিকানা।

​বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ত্যাগ এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব—এই সংগ্রামী মেলবন্ধন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য আখ্যান। জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর জীবনের দীর্ঘ লড়াই ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক উচ্চতা ও মানবিক মর্যাদা অর্জন করেছেন, তা তাঁকে জনমানসে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। বঙ্গমাতা থেকে জননেত্রী—এই উত্তরাধিকার কেবল একটি রক্তগত সম্পর্ক নয়, বরং এটি ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এক অমর সংগ্রামী পরম্পরা যা বাংলাদেশের পথচলাকে আলোকিত করে রেখেছে।

লেখকঃ মানিক লাল ঘোষ; সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত