469
Published on সেপ্টেম্বর 27, 2026একাত্তর সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরেরা এ দেশে নির্বিচার গণহত্যা চালিয়েছে। তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। ওরা পুরো দেশটাকেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। কিন্তু দুর্দান্ত সাহসী বাঙালির সঙ্গে ওরা পেরে ওঠেনি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ওরা বাধ্য হয়েছিল আত্মসমর্পন করতে, হার মেনে নিতে। তা সত্ত্বেও ওদের ষড়যন্ত্র থামেনি। গুপ্ত হত্যা, অগ্নিসংযোগসহ নানা অপতৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে নেমে আসে ১৯৭৫ সালের সেই ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা। ষড়যন্ত্রে যোগ দেয় সেনাবাহিনীর একটি অংশ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। কারাগারে আটক জাতীয় চার নেতাসহ আরো অনেক নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগ ও তার রাজনৈতিক ধারাকে নিশ্চিহ্ন করার সকল অপচেষ্টই চালানো হয়।
কান্ডারিহীন নৌকার মতো দল যখন দিকভ্রান্ত, ঠিক সেই সময়ে অত্যন্ত সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। সামরিক জান্তার বুটের তলায় দেশ ও দেশের মানুষের সব শুভ চিন্তা যখন পিষ্ট হচ্ছিল, তখন তিনি দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। সেই থেকে জনকল্যাণের কঠোর ব্রত সাধনায় অব্যাহত আছে তাঁর দীর্ঘ পথচলা। অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন বারবার। তবু সাহস হারাননি। পায়ে পায়ে পাথর সরিয়ে দেশের মানুষের জন্য তিনি তৈরি করেছিলেন গণতন্ত্রের এক শক্ত ভূমি। সেই পবিত্র ভূমি আজ আবার পরাজিত শক্তির দখলে। বঙ্গবন্ধুকন্যাকে বাধ্য করা হয় দেশ ছেড়ে যেতে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে তিনি পরবাসে। কিন্তু তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরেই ফিরে আসবেন। অশুভ শক্তিকে মোকাবিলা করবেন। প্রয়োজনে জীবন দেবেন। আবারো তার সেই অসীম সাহসী সিদ্ধান্ত।
একাত্তরের পরাজিত শক্তির প্রেতাত্মারা চারদিকে তোলপার করছে। তান্ডব চালাচ্ছে। রক্তের নেশায় উল্লাস করছে। বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান বানানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনে বঙ্গবন্ধুর ছবি নামিয়ে পাকিস্তানের জাতির জাতির পিতা জিন্নাহর ছবি টানানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের সব ভাষ্কর্য ভেঙে ফেলা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরানো হয়। তাদের ওপর আঘাত করা হয়। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। এসবই যেন বিশ্ব বাটপার ইউনূসের ‘রিসেট বাটন’ টেপার ঘোষণাকে অনুসরণ করছে। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস মুছে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু বাংলার মানুষ মরে যায়নি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ডাকসু ভবন থেকে জিন্নার ছবি নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। পদদলিত করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে একটি ’চেপে বসা অপশক্তি’ আজ একের পর এক ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জনকে নস্যাৎ করতে উঠেপড়ে লেগেছে। দেশকে আবার পাকিস্তানীকরণের চেষ্টা চলছে। শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বকে নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, কুৎসা রটনা করা হচ্ছে এবং দিনেরাতে মিথ্যার বেসাতি চলছে। বাঙালিকে, বাংলাদেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চলছে। আমরা জানি, তারা অতীতেও সফল হয়নি, আজও সফল হবে না। ১৯৮১ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা যে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে চলেছেন, যে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে চলেছেন, তা কখনো হেরে যাবার নয়। তিনি যে আদর্শ, যে প্রতিজ্ঞা মাথায় তুলে নিয়েছেন তাকে হারানো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ আজকের রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক অগ্রযাত্রায় আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর অবদান অনস্বীকার্য। অনস্বীকার্য বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার অবদানও। বাংলাদেশের বহু ইতিবাচক পরিবর্তনের অগ্রনায়ক তিনি। বলার অপেক্ষা রাখে না, তাঁকে ঘিরেই সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার শত্রুদের অন্তর্জ্বালা সেখানেই। তাঁরা শেখ হাসিনাকে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে, মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশকে সহ্য করতে পারে না। সে কারণে এই অশুভ শক্তি শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে, কোটালিপাড়ায় তাঁকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গ্রেনেড হামলা করা হয়েছে। প্রতিবারই বাংলার মানুষের ভালোবাসার কাছে পরাজিত হয়েছে শক্র। তারপরও ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি তাঁকে নিয়ে। সর্বশেষ আঘাত এসেছে ২০২৪ সালের আগস্টে।
কল্যাণমন্ত্রে যাঁর দীক্ষা, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘মানুষের ধর্ম’ যিনি ধারণ করেন হৃদয়ে, জনগণের সেবা যাঁর ব্রত, তিনিই তো অমৃতের সন্তান। সামরিকতন্ত্র ও ‘কার্ফিউ গণতন্ত্রে’র দেড় দশকের দুঃশাসন এবং গণতন্ত্রের নামে দুই দফায় এক দশকের অপশাসনের মূলোৎপাটন করে যিনি বাংলাদেশকে আজ নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। যে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চেতনা তিনি ধারণ করেন, তা বাস্তবায়নে তাঁর দার্ঢ্য আমাদের বিস্মিত করে। তাঁর এই দৃঢ়তার পরিচয় আমরা পেয়েছি ওয়ান-ইলেভেন নামের চেপে বসা শাসনামলেও। রাজনীতি থেকে তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা তখনো হয়েছে। মিথ্যা মামলা, দীর্ঘদিনের কারাবাস তাঁকে তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যূত করতে পারেনি। তাঁর এই অনমনীয় মনোভাব আজও অটুট। আজকের ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইন’ করা ষড়যন্ত্রও কর্পুরের মতো উড়ে যাবে।
‘মানুষের দায় মহামানবের দায়, কোথাও সীমা নেই। অন্তহীন সাধনার ক্ষেত্রে তার বাস।...দেশ কেবল ভৌমিক নয়, দেশ মানসিক। মানুষে মানুষে মিলিয়ে এই দেশ জ্ঞানে জ্ঞানে, কর্মে কর্মে।...আমরাও দেশের ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানকে উৎসর্গ করেছি। সেই ভবিষ্যকে ব্যক্তিগতরূপে আমরা ভোগ করব না।...ভবিষ্যতে যাঁদের আনন্দ, যাঁদের আশা, যাঁদের গৌরব, মানুষের সভ্যতা তাঁদেরই রচনা। তাঁদেরই স্মরণ করে মানুষ জেনেছে অমৃতের সন্তান, বুঝেছে যে তার সৃষ্টি, তার চরিত্র মৃত্যুকে পেরিয়ে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কথাগুলো শেখ হাসিনার জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি দেশের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করেছেন নিজের বর্তমান। ব্যক্তিগতভাবে বর্তমানকে ভোগ করেন না তিনি। আর সে কারণেই তিনি যেমন চেনেন বাংলার শ্যামল প্রকৃতি, তেমনি বাংলার মানুষ চেনে তাঁকে। বাঙালির সঙ্গে নিবিড় যোগসূত্র তাঁর জন্মান্তরের। দেশের মানুষের আস্থা ও অস্তিত্বে তাঁর স্থায়ী আসন। মানুষের পাশে থাকেন সব সময়।
শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই ‘মানুষের ধর্ম’ তাঁর ব্রত। তাঁর বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘সর্বজনীন ও সর্বকালীন মানব’ হিসেবে বাঙালি জাতির হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গকারী এই মহামানবের কন্যা শেখ হাসিনাও নিজেকে উৎসর্গ করেছেন মানুষের কল্যাণে। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম, পারিবারিকভাবেই তাই ‘কল্যাণমন্ত্রে দীক্ষা’ হয়েছে শৈশবে। রবীন্দ্রনাথের কথা ধার করেই তাঁর সম্পর্কে বলা যেতে পারে, তিনি ‘সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ’।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘মানুষ আছে তার দুই ভাবকে নিয়ে একটা তার জীবভাব, আর-একটা বিশ্বভাব। জীব আছে আপন উপস্থিতিকে আঁকড়ে, জীব চলছে আশু প্রয়োজনের কেন্দ্র প্রদক্ষিণ করে। মানুষের মধ্যে সেই জীবকে পেরিয়ে গেছে যে সত্তা সে আছে আদর্শ নিয়ে। এই আদর্শ অন্নের মতো নয়, বস্ত্রের মতো নয়। এ আদর্শ আন্তরিক আহবান, এ আদর্শ একটা নিগূঢ় নির্দেশ।’ পিতৃ-আদর্শের সেই আন্তরিক আহবান কিংবা নিগূঢ় নির্দেশেই সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা ফিরে এসেছিলেন পিতৃভূমিতে। তিনি ছিলেন নিতান্তই একা- এমনটি উপলব্ধি হতে পারে অনেকেরই। কিন্তু নিজ বাসভূমে মাটির সন্তানকে যে একাকীত্ববোধ গ্রাস করবে না, তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল ১৯৮১ সালে। মানুষকে মুক্তির দিশা দিতে পারেন, এমন একজন মানুষের বড় প্রয়োজন ছিল তখন। ঐ সময়ের একমাত্র দাবি ছিল সেটাই। শুধু সময়ের দাবি মেটাতেই নয়, মুক্তিকামী মানুষকে নতুন করে মুক্তির দিশা দিতেই তিনি ফিরে এসেছিলেন এই বিরান বাংলায়। মাটির টান আর মানুষের প্রবল ভালোবাসা সেদিন তাঁকে জুগিয়েছিল অদম্য সাহস ও শক্তি। সেই শক্তির বলেই তিনি সেদিন নিতে পেরেছিলেন সামরিকতন্ত্রকে উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত। সেদিন বাংলার মানুষ তাঁকে বরণ করে নিয়েছিল অশ্রুবৃষ্টির ভেতর দিয়ে। সেদিনের বিশাল জনসমুদ্র তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিল, তিনি একা নন। এই জাতি তাঁর সঙ্গে। জাতির সেই ভালোবাসা ও আস্থার জবাবে তিনিও জানিয়েছিলেন, বাংলার মানুষের দৈন্য দূর করতে তাঁর জীবন উৎসর্গীকৃত। সেদিন নিজেকে জাতির কাছে উজাড় করে দিয়েছিলেন তিনি। ‘কার্ফিউ’ নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়ে মানুষের নতুন মুক্তির ভিত্তি রচনা হলো সেই দিন।
এরপর তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী হন। দেশকে নিয়ে যান এক অনন্য উচ্চতায়। তাঁর দেশপ্রেম, মানবিকতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব ও স্বীকৃতির চিহ্ন হিসাবে শেখ হাসিনা ১৯৯৯ সালে ২২ সেপ্টেম্বর ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার পান। কৃষিতে অসামান্য অবদানের জন্য শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সেরেস পুরস্কারে ভূষিত হন। ইউনেস্কো শান্তিবৃক্ষ পদকে ভূষিত করেছে তাঁকে। শুধু আন্তর্জাতিক অর্জন নয়, তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন দেশের মানুষের আস্থা ও ভালবাসা।
কিন্তু দেশের ভেতরের ও বাইরের নানা ষড়যন্ত্র আবারও তাঁর পথ রুদ্ধ করেছে। ২০২৪ সালে ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইন করা’ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। দেশছাড়া করা হয়েছে। এদিকে গোপন-প্রকাশ্য নানা ধরনের চুক্তির মাধ্যমে দেশ বিক্রি করার অব্যাহত পায়তারা চলছে। শেখ হাসিনা সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, চট্টগ্রাম বন্দর ও করিডোর দিতে রাজি হননি বলে কিংবা বঙ্গোপসাগরে গ্যাস ও খনিজের একতরফা মালিকানা দিতে রাজি হননি বলে, যাদের চক্ষুশূল হয়েছিলেন, তাদের প্রিয়ভাজন ইউনূস আজ তাদের সব চাওয়া পূরণ করেছে। বিএনপি সরকার সেসবের বৈধতা দিয়েছে। কিন্তু একজন শেখ হাসিনা জীবিত থাকতে, বঙ্গবন্ধুর সৈনিকেরা জীবিত থাকতে ষড়যন্ত্রকারীদের কোনো স্বপ্নই পূরণ হবে না। বাংলাদেশের এক ইঞ্চি মাটিও কোনো বিদেশি শক্তিকে দেওয়া হবে না। মাটি ও মানুষের টানে শেখ হাসিনা শিগগিরই ফিরে আসবেন। এবং শেখ হাসিনার এই ফিরে আসা হবে আরো অনেক গৌরবময়। আরো অনেক বেশি তেজোদীপ্ত।
বাংলাদেশের সকল ইতিবাচক পরিবর্তনের অগ্রনায়ক তিনি। তাঁকে ঘিরেই সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ। এ দেশের মানুষের আস্থার প্রতীক তিনি। আজ তাঁর জন্মদিনে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি। দীর্ঘজীবী হোন তিনি।
লেখক: এম নজরুল ইসলাম; সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি